সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে নিরাপত্তা জোরদার করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ও বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন প্রাসাদের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করে থাকছেন তিনি। তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি দল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাত দিয়ে ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত হুথিদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে যুবরাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। রিয়াদে একের পর এক হামলায় জনজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুবরাজের সর্বশেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল মঙ্গলবার। সেদিন একটি জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রক্তদান করেন তিনি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর ছিল। হামলায় বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়ে। নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালাও ছিলেন। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলায় তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিমানবন্দর এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকা অবস্থায় সেখানে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ আঘাত হানে। এতে বিমানবন্দরের চতুর্থ টার্মিনালে আগুন ধরে যায় এবং আরও কয়েকজন আহত হন।
ধারাবাহিক হামলায় রিয়াদের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হচ্ছে। শহরের আর্থিক অঞ্চলে কর্মরত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী ও কূটনীতিকদেরও ভবন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে কিংবা আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আকাশে প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করা হলেও এর ধ্বংসাবশেষের আঘাতে বেসামরিক স্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা থাকায় রাজপ্রাসাদ ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো কৌশলগত স্থাপনায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচিও চাপে পড়েছে। পর্যটন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে দেশটি। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিওমের মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর প্রকল্প এবং রিয়াদে বেশ কয়েকটি বড় উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। হুথিরা সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে সৌদি আরব। পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে হুথিদের হুমকিও দেশটির অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। হামলার কারণে আন্তর্জাতিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে অথবা পুনর্মূল্যায়নের আওতায় এসেছে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন সৌদি যুবরাজ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপদেষ্টা দিলেও ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে সরাসরি সহায়তা চেয়ে সৌদি আরব যে অনুরোধ জানিয়েছে, তাতে এখনো সাড়া দেয়নি ওয়াশিংটন।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহান্তে বলেছেন, হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ চলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। বিমানবন্দরে হামলার পর ট্রাম্প বলেন, তারা যা করেছে, তা খুবই খারাপ।
এদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছেও সহায়তা চেয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথও খতিয়ে দেখছে দেশটি।
সব মিলিয়ে হুথিদের ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরবের রাজধানীর নিরাপত্তা এবং দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর, দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানো, বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত এবং যুবরাজের নিরাপত্তা জোরদারের খবর দেশটিকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে চাপের মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ লুটতে চায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: আইআরজিসি উপদেষ্টা
'প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নতুন অস্ত্র তৈরি করছে ইরান'
'পারস্য সভ্যতা নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো আগুন নিয়ে খেলার শামিল'
মার্কিন নিরাপত্তা ছাতা থেকে বেরিয়ে আসুন: আবোলফজল শেখারচি
গাজায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চললেও বিশ্ব কার্যত নীরব: পেজেশকিয়ান