ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা অনেকটাই থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ওলেক্সান্দর সিরস্কি। তাঁর ভাষ্য, রুশ বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত হওয়ায় দেশটির আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে যুদ্ধের হতাহত ও ভূখণ্ড দখলের পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সিরস্কি এসব কথা বলেন। গ্রীষ্মে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকার। ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন, রুশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি, ড্রোনযুদ্ধ এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন তিনি।
রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি ছয় গুণ বেশি, দাবি সিরস্কির
সিরস্কির দাবি, যুদ্ধে রাশিয়ার মোট ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনের তুলনায় ছয় গুণ বেশি। শুধু নিহতের হিসাব ধরলে এই অনুপাত ১১ গুণ পর্যন্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সেনাদের নিহতের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা প্রকাশ করে না। ফলে সিরস্কির দেওয়া এই হিসাব স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হিসাবে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়ার প্রায় পাঁচ লাখ সেনা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইউক্রেনের নিহত সেনার সংখ্যা দেড় লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রুশ সেনাদের রেকর্ডসংখ্যক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এ দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ছয় মাসে রাশিয়ার দখল মাত্র ৬১ বর্গকিলোমিটার
সিরস্কির মতে, রাশিয়ার সেনা ক্ষয়ক্ষতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিকাশ এবং রুশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গায় ইউক্রেনের পরিকল্পিত আক্রমণ—সব মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়া সব মিলিয়ে মাত্র ৬১ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখল করতে পেরেছে। তাঁর মতে, এটি প্রমাণ করে যে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ইউক্রেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) একটি সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও রাশিয়ার অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া যত ভূখণ্ড দখল করেছে, তার চেয়ে বেশি ভূখণ্ড হারিয়েছে।
দায়িত্ব হারানোর পেছনে কী ঘটেছিল?
২০২৪ সালে ইউক্রেনের সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সিরস্কি। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুর দিকে কিয়েভ রক্ষায় ভূমিকা এবং ওই বছরের শরতে খারকিভ অঞ্চলে সফল পাল্টা অভিযানের জন্য তিনি প্রশংসা পেয়েছিলেন।
তবে এ বছরের গ্রীষ্মে তাঁর সঙ্গে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরভের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ফেদোরভের অভিযোগ ছিল, যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বদলে সিরস্কির নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগে বাধা দিচ্ছিল।
পরে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন। সিরস্কির স্থলাভিষিক্ত হন মেজর জেনারেল মাইখাইলো দ্রাপাতি।
সিরস্কি বলেন, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি ফেদোরভ। তাঁর অভিযোগ, ফেদোরভ ড্রোনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে চালকবিহীন স্থলযান, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ সম্মুখসারির গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের সরবরাহ উপেক্ষা করেছিলেন। ড্রোনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির ৮০ শতাংশ ড্রোনে?
প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ পরিচালনায় নিজের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার জবাবও দিয়েছেন সিরস্কি। তাঁর দাবি, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে ইউক্রেনের ড্রোনের ব্যবহার অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে। এমনকি শত্রুপক্ষের দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পেছনে হামলা চালানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
সিরস্কির ভাষ্য, রাশিয়ার সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী ইউক্রেনের ড্রোন। তবে এই পরিসংখ্যানও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইউক্রেনই প্রথম আলাদা শাখা হিসেবে চালকবিহীন যুদ্ধব্যবস্থা বাহিনী গঠন করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা আরও বাড়বে।
সেনাদের পিছু হটার নির্দেশ নিয়ে বিতর্ক
সিরস্কির সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে ইউক্রেনের কিছু সেনার সমালোচনাও রয়েছে। বিবিসিকে আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কয়েকজন সেনা অভিযোগ করেছিলেন, রুশ বাহিনীর হাতে প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেও তাঁদের অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হতো। পিছু হটার অনুমতি যখন আসত, ততক্ষণে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠত এবং প্রাণহানি বাড়ত।
সিরস্কি এমন পরিস্থিতি ঘটার কথা অস্বীকার করেননি। তবে তাঁর যুক্তি, ইউক্রেনকে তুলনামূলক অনেক শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুদ্ধবিমান ও বোমার সংখ্যায় রাশিয়া ইউক্রেনের চেয়ে ১৮ গুণ এগিয়ে ছিল। একই বছর রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি কামান ও গোলাবারুদ ছিল। এ ছাড়া রাশিয়ার প্রায় ৪০ লাখ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষকে যুদ্ধে নিয়োগ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কুরস্ক অভিযানকে ‘প্রয়োজনীয়’ বলছেন সিরস্কি
২০২৪ সালের আগস্টে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের আকস্মিক অভিযান সিরস্কির সবচেয়ে আলোচিত সামরিক পদক্ষেপগুলোর একটি। পরের বসন্তে ইউক্রেনীয় বাহিনী সেখান থেকে পিছু হটে। কয়েকজন সেনা ওই প্রত্যাহারকে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করেছিলেন।
কিন্তু সিরস্কির মতে, অভিযানটি ছিল প্রয়োজনীয়। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে রুশ বাহিনী সম্মুখসারির প্রধান দিকগুলোতে ইউক্রেনের তুলনায় ছয় গুণ বেশি সেনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। কুরস্ক অভিযান রাশিয়াকে সেনা পুনর্বিন্যাসে বাধ্য করে এবং পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের চাপে থাকা ব্রিগেডগুলোকে পুনর্গঠনের সময় দেয়।
ইউরোপকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান
ইউক্রেনের বাইরে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন সিরস্কি। রাশিয়ার ইউক্রেনের বাইরেও ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাকে যাঁরা উড়িয়ে দেন, তাঁদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর পরামর্শ, ইউরোপের দেশগুলোর এখনই সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত এবং যুদ্ধ তাদের কাছে পৌঁছাবে না—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
সিরস্কির মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। রোবট, স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়বে। প্রচলিত অস্ত্রের সক্ষমতা বাড়াতেও এআইভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহৃত হবে।
ট্যাংকের মতো প্রচলিত সামরিক যানও নতুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষই সাঁজোয়া যানকে আক্রমণ থেকে রক্ষার সক্রিয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা নির্ধারক থাকবে বলে জোর দিয়েছেন ইউক্রেনের সাবেক এই সেনাপ্রধান। তাঁর মতে, উন্নত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাগুলোও পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষের প্রয়োজন হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কনের অবদান কতটুকু?
মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে জবাব চূড়ান্ত করছে ইরান: উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মোদী পদত্যাগ করলে ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান কে হবেন, সংবিধান কি বলে?