শত্রুর যেকোনো দুঃসাহসের দাঁতভাঙা জবাব দেবে ইরান: আইআরজিসি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

শত্রুপক্ষ নতুন করে কোনো সামরিক দুঃসাহস দেখালে তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিকবিষয়ক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি। তিনি বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সামরিক চাপ কিংবা নৌ অবরোধ, কোনো পথেই ইরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা যাবে না।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) উত্তরাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশের প্রশাসনিক পরিষদের এক সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে জাভানি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বযুদ্ধ বলা না হলেও বৈশ্বিক জনমত একে বিশ্বযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সংঘাত হিসেবেই দেখছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাভানির ভাষ্য, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বর্তমান সংঘাতও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিন্যাস এবং বিভিন্ন শক্তির পারস্পরিক সমীকরণে পরিবর্তন আনছে। তাঁর দাবি, এই যুদ্ধের পরিণতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের জনগণ, প্রতিরোধ ফ্রন্ট ও অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে বিজয়ী হতে দেখবে।

ইরানের বিজয়ের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়েও মন্তব্য করেন আইআরজিসির এই কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, ইরানের পরাজয় নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। সে কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় মেনে নিতে চাইছেন না বলে মনে করেন জাভানি।

গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ‘রমজান যুদ্ধের’ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হিসাব-নিকাশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ ধারণা করেছিল, নতুন করে আগ্রাসন চালিয়ে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু তাদের সেই হিসাব বাস্তবে মেলেনি বলে দাবি করেন তিনি।

জাভানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়ে ইমাম খোমেনির দৃঢ় অবস্থান এবং শহীদ কাসেম সোলাইমানির সেই প্রত্যয়, যুদ্ধ শুরু করলে তার পরিণতি নির্ধারণ করবে ইরান, বর্তমান সংঘাতেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তেহরান এই যুদ্ধকে কেবল সামরিক সংঘাত হিসেবে নয়, বরং নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানের পরীক্ষার হিসেবেও দেখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাভানি। তাঁর দাবি, মার্কিন রাজনীতিকেরাও স্বীকার করেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মতো সামরিক সুবিধা ট্রাম্পের হাতে আর অবশিষ্ট নেই। অন্যদিকে, ইরান এখনো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তাই শত্রুপক্ষের যেকোনো নতুন পদক্ষেপের জবাবে ইরান কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম যুক্ত হওয়ায় দেশটির সক্ষমতা বেড়েছে বলেও দাবি করেন আইআরজিসির এই কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, ইরানের সামরিক প্রস্তুতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরিগুলোকে দেশটি থেকে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার দূরে সরে যেতে হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের সামরিক উপস্থিতি প্রসঙ্গে জাভানি দাবি করেন, আগে এই অঞ্চলে শতাধিক সামরিক জাহাজ ও যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করলেও বর্তমানে সেখানে বিদেশি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি নেই। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক অবস্থানের কারণে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক চাপ প্রয়োগের হিসাব আগের মতো সরল নেই।

তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ আবারও ভুল হিসাব করতে পারে। তবে ইরান এখন আকস্মিক হামলার ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়েছে। সম্ভাব্য আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে এবং নতুন কোনো ভুল পদক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নৌ অবরোধের পরিকল্পনাকেও অবাস্তব বলে আখ্যা দেন জাভানি। তাঁর মতে, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে সমুদ্রপথ আটকে দিয়ে দেশটিকে চাপে ফেলা সম্ভব নয়।

জাভানি বলেন, নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করা যাবে না; একইভাবে আকাশপথ বা স্থলপথ অবরুদ্ধ করেও দেশটিকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তাঁর দাবি, চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচার ও জনমত প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই শত্রুপক্ষ অবরোধের মতো পদক্ষেপের কথা ভাবছে।

আইআরজিসির এই কমান্ডারের বক্তব্যে তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট: সামরিক হুমকি, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা, কোনোটির কাছেই ইরান নতি স্বীকার করবে না। বরং নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে দেশটি। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত