ইউক্রেনের প্রধান ভরসা ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। কারণে সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন পরিচালনা, শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, গোলন্দাজ বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সরবরাহ এবং সামরিক কমান্ডের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ইলন মাস্কের মহাকাশপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক। ফলে এই নেটওয়ার্কের গতি বা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ইউক্রেনের যুদ্ধে স্টারলিংকের গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেটওয়ার্কটির গতি ও ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধের অভিযোগ ঘিরে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় স্টারলিংক ব্যবহার করে আসছে। তবে বিধিনিষেধের কারণ এবং এর পেছনে কার সিদ্ধান্ত রয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের মেরুদণ্ড
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) উদ্ভাবন ও ওপেন সোর্স গবেষণা বিভাগের পরিচালক জর্জ ব্যারোসের ভাষায়, ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে স্টারলিংক। বিবিসিকে তিনি বলেন, দেশটির নৌ, স্থল ও আকাশ তিন বাহিনীতেই এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক বা প্রচলিত যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলে কিংবা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়লে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বিকল্প যোগাযোগের সুযোগ দেয়। স্টারলিংকের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর টার্মিনাল সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকা বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলেও যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হয়, যেখানে প্রচলিত নেটওয়ার্কের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই সক্ষমতা শুধু বার্তা পাঠানো বা ভিডিও কলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেনা কমান্ড, নজরদারি ড্রোন, গোলন্দাজ ইউনিট এবং মাঠপর্যায়ের সেনাদের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানেও এটি সহায়তা করে। ব্যারোসের মতে, এ ধরনের নেটওয়ার্ক ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী ও কমান্ড পোস্টকে একটি সমন্বিত রিয়েল-টাইম ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারে। এর ফলে কোনো লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত হওয়ার পর সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগ পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
ড্রোন যুদ্ধে স্টারলিংকের ভূমিকা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন এখন নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনেক ক্ষেত্রে ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি ও ভিডিও দ্রুত অপারেটরের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন হয়। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ড্রোনের গতিপথ পরিবর্তন, লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ কিংবা অন্য সামরিক ইউনিটকে সতর্ক করা হয়। স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা এ কাজে উচ্চগতির তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে। প্রচলিত যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কম থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টারলিংক-সংযুক্ত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন রাশিয়ার জেটচালিত শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও ইউক্রেনের কার্যকর ব্যবস্থাগুলোর একটি। এসব ড্রোনের গতি ঘণ্টায় ১৯৮ মাইলের বেশি হতে পারে। ফলে দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুকে অনুসরণ ও প্রতিহত করতে ড্রোনের সঙ্গে অপারেটরের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী ফেলো টম হুইটিংটন বিবিসি রেডিও ফোরের ‘পিএম’ অনুষ্ঠানে বলেন, স্টারলিংক স্মার্টফোনের মতো ভিডিও, লেখা ও কণ্ঠস্বরসহ বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ দেয়। তবে এর জন্য প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো অবকাঠামো প্রয়োজন হয় না।
হুইটিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, নেটওয়ার্কের গতিসীমা এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হলে যে সংযুক্ত কোনো ব্যবস্থা ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলতে পারবে না, তা ড্রোনের নেভিগেশন ও পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইউক্রেনের ভেতরে এবং রুশ-অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে পরিচালিত ড্রোনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ মনে করেন, স্টারলিংকের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের সময়টি কাকতালীয় নয়। তার ধারণা, ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার সমালোচনা করেছেন। ইউক্রেনের নেতৃত্ব নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন। ইলন মাস্কও ইউক্রেনের এসব হামলার সমালোচনায় ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিধিনিষেধের সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিরোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের পার্থক্য
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের সম্পর্ক। স্টারলিংক মূলত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। অন্যদিকে, স্টারশিল্ড হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য স্পেসএক্সের তৈরি সামরিক ব্যবহারের উপযোগী স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যবস্থা।
মাস্কের বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি ব্যবস্থা পৃথক। তবে অনেক ক্ষেত্রে এগুলো একই ধরনের স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক বলেছেন, স্টারশিল্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে। এ ব্যবস্থার গতি বা ব্যবহার-সংক্রান্ত সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে, স্টারলিংক স্পেসএক্সের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক সেবা।
তার বক্তব্য, স্টারলিংকের ব্যবহার বেসামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ; বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে এটি ব্যবহার করা অনুচিত। এই বক্তব্যে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে ইউক্রেনের ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ঠিক কোন বিধিনিষেধ কে আরোপ করেছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আরও স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
রাশিয়ার ওপর প্রভাব
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। সরবরাহ করা বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধের চার বছরে স্যাটেলাইট যোগাযোগ দুই পক্ষের সামরিক কার্যক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে চলন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনে রাশিয়ার হামলার ঘটনাতেও স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তির ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে রুশ বাহিনীর স্টারলিংক ব্যবহার সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছিল স্পেসএক্স। এতে রাশিয়ার সামরিক সুবিধা কিছুটা কমে যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কেন বিকল্প তৈরি কঠিন?
স্টারলিংকের মতো নেটওয়ার্কের বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়। এর জন্য শুধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করলেই হয় না; প্রয়োজন উপযুক্ত টার্মিনাল, বিস্তৃত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, নির্ভরযোগ্য তথ্য পরিবহনব্যবস্থা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিগত সমন্বয়। যুদ্ধের মধ্যে দ্রুত নতুন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা আরও কঠিন। নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ড্রোন ও সামরিক কমান্ডের বিদ্যমান প্রযুক্তির সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করতেও সময় লাগে।
এ কারণেই স্টারলিংকের ওপর নির্ভরতা ইউক্রেনের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়। যোগাযোগের গতি কমে গেলে শুধু একটি ইন্টারনেট সেবাই ব্যাহত হয় না; ড্রোনের তথ্য পাওয়া, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নির্ধারণ, ইউনিটগুলোর সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে স্টারলিংক এখন কেবল ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যম নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধের যোগাযোগ, নজরদারি ও দ্রুত সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এই নেটওয়ার্কের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব তাই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার বাইরেও ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সূত্র: বিবিসি।
রিয়াদে হামলায় নিহত তালাল ফিরছিলেন পরিবারের কাছে
হরমুজে উত্তেজনার মধ্যেও বিশ্ববাজারে কমলো তেলের দাম
অক্টোবরে হরমুজ প্রণালিতে ২০ হামলা
সৌদিতে হুথিদের হামলা ‘বর্বরোচিত অপরাধ’: সুদানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
হরমুজ প্রণালির কাছে হামলায় ডুবলো দুই জাহাজ, নিহত ১