রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা, ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালেন জেলেনস্কি

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি থেকে সরে এসে রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রিয়াজান অঞ্চলে অবস্থিত শোধনাগারটিতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষণা করেন, রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আর বহাল থাকছে না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অবরোধ উঠে গেছে। আর নয়।’

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি জানান, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে ইউক্রেনের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর কিয়েভ রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা স্থগিত করেছিল। তবে এরপরও রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ জ্বালানি অবকাঠামোও ছিল। এতে কয়েক লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আহ্বান থেকে সরে আসা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য সমালোচনা ইউক্রেন ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে এটিকে সবচেয়ে বড় ফাটলগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্রযুক্তি ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়লে যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউক্রেনীয়রা।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি রসনেফটের মালিকানাধীন রিয়াজানের শোধনাগারটি দেশটির মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় পাঁচ শতাংশের জন্য দায়ী। রাজধানী মস্কোতে জ্বালানি সরবরাহেও এর ভূমিকা রয়েছে। অঞ্চলটির গভর্নর পাভেল মালকভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ইউক্রেনের বড় ধরনের ড্রোন হামলায় শোধনাগারটিতে আগুন ধরে যায়।

তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার প্রভাবকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেননি। তাঁর ভাষায়, এসব হামলায় ‘বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিছুই’ ঘটেনি।

রোববার ট্রাম্প আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে। তাঁর এই ঘোষণায় দুই পক্ষই বিস্মিত হয়েছিল। বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলাকে দায়ী করে আসছেন ট্রাম্প। এ কারণে কিয়েভকে হামলা বন্ধের চাপও দেন তিনি। তবে জেলেনস্কির অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও রাশিয়া একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে গেছে।

জেলেনস্কি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ, পুতিনের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য প্রশংসা এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কিংবা বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের প্রতি তাঁর আকর্ষণেরও সমালোচনা করেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেন যে তিনি এ ধরনের মানুষকে ভালোবাসেন এবং সম্মান করেন। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের কাছে যাঁরা ২০, ৩০ কিংবা ৪০ বছর ধরে নেতৃত্ব দিতে পারেন, তাঁদের শক্তিশালী বলে মনে হয়।

ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, চলতি সপ্তাহে স্পেসএক্সের সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক ব্যবস্থার গ্রাহকযন্ত্রের কার্যক্ষমতায় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা ইউক্রেনের ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। তাঁর মতে, এটি কোনো কারিগরি সমস্যা ছিল না; বরং নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, ইউক্রেনে স্টারলিংক সেবা পুনরায় চালু হওয়াকে তিনি ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দুই পক্ষকে সম্মিলিতভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ফক্স নিউজকে স্ট্রিটিং বলেন, ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্পের সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। যুদ্ধ শেষ করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এদিকে শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে জেলেনস্কির। সম্মেলনের আগে একাধিক বৈঠকে তিনি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ডের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক। বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, স্টারশিল্ড ব্যবস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে। এর গতি বা ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে তাঁরা স্বাভাবিক সতর্কবার্তা পাচ্ছেন না। এসব সতর্কবার্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা হয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প।

এদিকে দ্রুতগতিতে চলা যান বা বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করলে ইউক্রেনে সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক গ্রাহকযন্ত্রগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছিল। এতে ইউক্রেনের ড্রোনগুলোর কার্যক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছিল, কারণ দেশটির ড্রোনগুলো ইউক্রেনের আকাশসীমায় লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে এসব যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বৃহস্পতিবার জানায়, চলন্ত অবস্থায় যন্ত্রগুলো এখন কাজ করছে, তবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, মাঝারি পাল্লার হামলা এবং রুশ ড্রোন ঠেকাতে ব্যবহৃত প্রতিরোধী ড্রোনের জন্য এই গতি যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাশিয়া মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে জেটচালিত ড্রোন উৎক্ষেপণের একটি বড় ঘাঁটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিয়েভের দাবি, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা রুশ বোমাবর্ষণের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের হামলাই তাদের হাতে থাকা প্রধান উপায়। এসব হামলার কারণে রাশিয়ায় জ্বালানি সংকটও দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর চাপের মধ্যেও রয়েছেন ট্রাম্প। তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যেখানে তাঁর রিপাবলিকান দলকে ভোটারদের মুখোমুখি হতে হবে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে ট্রাম্পের দাবি, ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলাও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে কৃষ্ণসাগরে রোমানিয়ার উপকূলের কাছে দুটি রাসায়নিকবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় নিখোঁজ সাত নাবিকের সন্ধানে উদ্ধারকারীরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। ইউক্রেনের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে চালানো সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে এটি সর্বশেষ ঘটনা।

রাশিয়ার ক্রেমলিন বৃহস্পতিবার বলেছে, ইউক্রেনের রুশ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রচেষ্টার পরিপন্থী। ক্রেমলিনের দাবি, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতির সুনির্দিষ্ট পরিধি কখনোই নির্ধারিত হয়নি এবং এ বিষয়ে আলোচনা এখনো চলছে। সূত্র: বিবিসি

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত