কঙ্গোতে ইবোলা মোকাবিলায় গিয়ে হামলায় নার্স নিহত

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা সংক্রমণের সতর্কবার্তায় সাড়া দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। এতে এক নার্স নিহত এবং অপর এক স্বাস্থ্যকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

বিশ্বের দ্রুততম গতিতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এটি সর্বশেষ হামলার ঘটনা। কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের হামলা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস রোববার (২৫ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, শনিবার কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় তশোপো প্রদেশের বাফওয়াসেন্দে শহরে এ হামলা ঘটে।

তিনি বলেন, প্রাণঘাতী এ রোগ থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিতে যারা কাজ করছেন, তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কখনোই হামলার লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়। ডব্লিউএইচওর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব জানাবিও এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কোনো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না। ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে। ভুল তথ্য ও আতঙ্ক যেন কখনো সহিংসতার কারণ না হয়। তবে হামলার ঘটনা বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

অবিশ্বাস ও ভুল তথ্য বাধাগ্রস্ত করছে ইবোলা মোকাবিলা

কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশটিতে ইবোলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে। এ সময়ে ৪ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এটি কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব। প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতির কারণে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ ইবোলার অস্তিত্বকেও সাজানো ঘটনা বলে দাবি করছেন।

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, রোগটি সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ ও অবিশ্বাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কাজকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং নতুন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন তারা। এসব এলাকায় চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যকর্মীরও ঘাটতি রয়েছে।

গত মাসে উত্তর কিভু প্রদেশে ইবোলা মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলার পর এক রাজনীতিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একটি রেডিও অনুষ্ঠানে তিনি জনগণকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও হাত ধোয়ার বিষয়টিও ছিল।

প্রাদুর্ভাবের শুরুতে গত মে মাসে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি পৃথক হামলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দুটি তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দেন ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যসেবা এলাকায় তাদের দলের সদস্যদের আটকে রাখা হয়েছে কিংবা হুমকি দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ইবোলা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমে বাড়তি বাধা তৈরি করছে।

চার দেশে ছড়িয়েছে ইবোলা, সতর্কতা জোরদার

বর্তমান প্রাদুর্ভাব আফ্রিকার পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের চারটি দেশে শনাক্ত হয়েছে। মহাদেশটিতে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যাপক প্রাদুর্ভাব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোববার উগান্ডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্রিস বারিওমুনসি ঘোষণা করেন, কঙ্গো ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে এমন উগান্ডার নাগরিকেরা দেশে ফিরলে তাদের ২১ দিনের কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে।

গত জুলাইয়ে সর্বশেষ ইবোলা প্রাদুর্ভাবের অবসান ঘোষণা করে উগান্ডা। দেশটি নিজেদের ইবোলামুক্ত বললেও সম্প্রতি উগান্ডা হয়ে যাওয়া দুজনের শরীরে পরে কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় ইবোলা শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ইবোলা মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসের ধরনটির নাম ‘বান্দিবুগিও’। এ ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অনুমোদিত কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে সংস্থাটি সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে নজরদারি ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রমণ বা বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্র: আল-জাজিরা

জেএম
আরও পড়ুন