যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাওয়ার খবর মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কংগ্রেসে নিজের নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের অর্থ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের পদ বা নির্বাহী ক্ষমতা হারানো নয়। তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা বহাল থাকবে; পরিবর্তন আসবে মূলত কংগ্রেসের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্যে।
নির্বাচনের ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে পৃথক। ফলে সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্ট তাঁর পদ হারান না।
১. সিনেটে নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতায় বাধা
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, ফেডারেল আদালতের বিচারক, মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন দিতে পারেন। কিন্তু এসব নিয়োগের অনেক ক্ষেত্রেই সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন।
এখন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় তারা ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে, বিলম্বিত করতে অথবা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে।
বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে নতুন বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত সিনেটের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন দেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না; পরিবর্তন হচ্ছে অনুমোদনের নিয়ন্ত্রণে।
২. সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নিয়ন্ত্রণ হারানো
সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সাধারণত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্ব ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
ডেমোক্র্যাটরা দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব কমিটির নেতৃত্ব পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ব্যয়, অভিবাসননীতি ও সরকারি কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের সুযোগ বাড়বে।
কমিটিগুলো শুনানি আয়োজন, নথিপত্র তলব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে।
এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কংগ্রেসের সামনে আরও বেশি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
৩. পররাষ্ট্রনীতিতে চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাধা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে আনুষ্ঠানিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, চুক্তি অনুমোদনে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় ট্রাম্পের প্রশাসন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের জন্য আরও কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, সব আন্তর্জাতিক সমঝোতা বা নির্বাহী চুক্তির ক্ষেত্রে একই অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়।
৪. প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও জবাবদিহি বাড়বে
এটি ট্রাম্পের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের কমিটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে।
সম্ভাব্য তদন্তের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ও এর ব্যয়।
- ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি।
- শুল্কনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
- অভিবাসনবিষয়ক সরকারি অভিযান।
- প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত ও সরকারি অর্থের ব্যবহার।
- প্রেসিডেন্টের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড।
তদন্তের জন্য শুনানি আয়োজন, তথ্য-নথি চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করা হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের তদন্তের ক্ষমতা থাকলেও কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত আগাম দেওয়া যায় না।
৫. সরকারি বাজেট ও অর্থ বরাদ্দ নিয়ে চাপ বাড়বে
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ও সরকারি ব্যয় অনুমোদনে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সরকারি ব্যয়, প্রতিরক্ষা বাজেট, সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির অর্থ বরাদ্দ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
এমনকি বাজেট নিয়ে সমঝোতা না হলে সরকারি কার্যক্রম আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার (Government Shutdown) ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, নির্বাচনের ফল যাই হোক, ২০২৭ সালে ঋণসীমা ও সরকারি অর্থায়ন নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।
৬. অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের চাপ বাড়তে পারে
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর রাজনৈতিক উদ্যোগও দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের অভিযোগ আনতে পারে প্রতিনিধি পরিষদ। সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অভিশংসন প্রস্তাব পাস করা সম্ভব।
এরপর সিনেটে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা শুধু সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ট্রাম্পকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। এর জন্য প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ এবং সিনেটে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও গুরুত্বপূর্ণ।
৭. আইন প্রণয়নে বাধা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের নিজস্ব আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
সিনেটে অধিকাংশ সাধারণ আইন নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করে চূড়ান্ত ভোটে যেতে সাধারণত ৬০ ভোটের প্রয়োজন হয়। ফলে ৫১ আসন পেলেও ডেমোক্র্যাটরা এককভাবে সব আইন পাস করতে পারবে না।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত আইনও ডেমোক্র্যাটদের আপত্তির মুখে আটকে যেতে পারে।
এতে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাহলে ট্রাম্পের কোন ক্ষমতাগুলো বহাল থাকছে? নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় মানেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তাঁর হাতে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা থাকছে।
১. যে ক্ষমতা বহাল থাকবে
প্রেসিডেন্টের পদ: মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন
ভেটো ক্ষম: কংগ্রেসে পাস হওয়া বিলে ভেটো দিতে পারবেন
সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক: কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন
পররাষ্ট্রনীতি: কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আলোচনা চালাতে পারবেন
নির্বাহী আদেশ: আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারবেন
প্রশাসনিক নেতৃত্ব নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন
রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা ও বিস্তৃত নির্বাহী কর্তৃত্ব বহাল থাকবে।
স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সকালের নাশতায় রাখুন এই ৫ খাবার
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে আজও উত্তপ্ত গাজীপুর
হরমুজে চার তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস, ৫৬তম মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত: আইআরজিসি
আজ থেকে ৪ দিন সারাদেশে গ্যাসের চাপ কম থাকবে
আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি, বিদায় বাংলাদেশ: আসিফ মাহমুদ