যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান আবের কাওয়াস। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য আইনসভার প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য। একই সঙ্গে হিজাব পরিহিত প্রথম নারী হিসেবেও এই আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
মিডল ইস্ট আইয়ের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের ডিস্ট্রিক্ট-১২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন কাওয়াস। ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর নিউইয়র্ক টাইমস তাঁর জয় ঘোষণা করে।
বিজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় কাওয়াস লেখেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি।’
নির্বাচনী প্রচারে তাঁর স্লোগান ছিল—‘মর্যাদায় বিনিয়োগ, ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই’। স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত করা, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের পক্ষে তাঁর অবস্থানকে ‘মর্যাদায় বিনিয়োগ’ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা এবং যুদ্ধের পেছনে অর্থ ব্যয় বন্ধের দাবিকে গুরুত্ব দিয়েছেন ‘ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই’ স্লোগানে।
কাওয়াস ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) সদস্য। নিউইয়র্কের বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সংগঠনটির প্রভাব বাড়ছে। গত বছর জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ডিএসএ-সমর্থিত প্রার্থীদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। কাওয়াসের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মামদানি, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালাইবের মতো প্রগতিশীল রাজনীতিকেরা।
রাজনীতিতে আসার আগে ১৫ বছরের বেশি সময় শ্রমিক অধিকার, অভিবাসী জনগোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন কাওয়াস।
২০২৩ সালে নিউইয়র্কের দাতব্য সংস্থাগুলোর অর্থ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারত্বকে সহায়তা করে—এমন সংগঠনের কাছে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে তিনি ‘নট অন আওয়ার ডাইম’ নামে একটি প্রচারণা গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখেন। এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল, নিউইয়র্কের অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ যেন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বা দখলদারত্বে সহায়তা না করে।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের মে মাসে ‘এন্ডিং নিউইয়র্ক ফান্ডিং অব ইসরায়েলি সেটলার ভায়োলেন্স অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন অ্যাসেম্বলি সদস্য জোহরান মামদানি এবং সিনেটর জাবারি ব্রিসপোর্ট এতে যুক্ত ছিলেন। তবে আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার কারণে বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়নি।
মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাওয়াস বলেন, ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার নিয়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কীভাবে রাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্যোগ নিতে পারেন, তা কাছ থেকে দেখে তাঁর রাজনীতিতে আগ্রহ তৈরি হয়।
ব্রুকলিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কাওয়াসের বাবা-মা ফিলিস্তিনি। তাঁরা ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেন। শৈশবে পরিবারের অভিবাসন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে।
নবম শ্রেণির আগেই, স্কুলজীবনে তাঁর বাবাকে আটক করে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়। বাবার অনুপস্থিতিতে পরিবারের আর্থিক ও মানসিক সংকট তৈরি হয়। কাওয়াসের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের অল্প বয়স থেকেই উপার্জনে যুক্ত হতে হয়েছিল।
এ অভিজ্ঞতার কারণে অভিবাসীদের অধিকার তাঁর রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়। তিনি নিউইয়র্কে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিইর (ICE) সঙ্গে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা বন্ধ করতে চান। এ লক্ষ্যে ‘নিউইয়র্ক ফর অল অ্যাক্ট’ পাসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সংস্থাগুলোর সঙ্গে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা সীমিত হবে।
কাওয়াসের মতে, আইসিইর হাতে একজন অভিবাসী আটক হলে শুধু ওই ব্যক্তি নন, তাঁর পুরো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবারের উপার্জন, জীবনযাপন এবং মানসিক স্থিতি—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকর অবস্থান ভাঙতে চান কাওয়াস। তাঁর অভিযোগ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের কাছে কথা বললেও খুব একটা সাড়া পাওয়া যেত না। ইসরায়েল সরকারের সমালোচনা করলে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন ধারণা রাজনীতিতে প্রচলিত ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চলতি বছরের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আগমনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন কাওয়াস। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) সঙ্গে ইসরায়েলি নজরদারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কগনাইটের ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের একটি চুক্তিরও বিরোধিতা করেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ওই প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল ফোনের অবস্থান ও তথ্য নজরদারির সক্ষমতা বাড়তে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা ছিল। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের মুখে গত সপ্তাহে এনওয়াইপিডি চুক্তি থেকে সরে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাওয়াসের এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনপন্থী সক্রিয়তা এবং অভিবাসী ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নতুন তাৎপর্য তৈরি করেছে। নিউইয়র্কের আইনসভায় তাঁর প্রবেশ ফিলিস্তিনি-আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হলেন এল সায়েদ
‘ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা আমার হাতে’
এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে ইসি
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব ক্ষোভে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলো ডেমোক্র্যাটরা
নতুন পে স্কেল নিয়ে এত বিরক্তি কেন, কার লাভ আর কার ওপর চাপ?