জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণে কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র শিক্ষকের চেয়ে জুনিয়র শিক্ষকের মূল বেতন বেশি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ। একই সঙ্গে চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন এবং বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি সংশোধনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ বিষয়ে ‘কর্মচারীদের বেতন গ্রেড-ভাতা নির্ধারণ ও পরিবর্তন-পরিমার্জনের বিষয় পর্যালোচনা কমিটি’র কাছে লিখিত আবেদন করেছে পরিষদ। আবেদনে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর উচ্চতর গ্রেডসংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়ন এবং নতুন বেতন কাঠামোয় জ্যেষ্ঠতার যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের দাবি
আবেদনে বলা হয়, জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ৭(১) ও ৭(২) অনুযায়ী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত স্থায়ী সরকারি কর্মচারীদের নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ১০ বছর চাকরি পূর্তির পর পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড এবং এরপর পদোন্নতি না হলে আরও ছয় বছর পর পরবর্তী গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে চাকরির মেয়াদ গণনা, বেতন স্কেল উন্নীতকরণ এবং উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যাখ্যা ও হিসাবের জটিলতায় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। এর ফলে দীর্ঘদিন চাকরি করেও অনেক শিক্ষক প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২০ সালে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত হন সহকারী শিক্ষকরা
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীত করে ১৩তম গ্রেডে নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকেরা ১৪তম এবং প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকেরা ১৫তম গ্রেডে বেতন পেতেন।
পরবর্তী সময়ে নতুন গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং উচ্চতর গ্রেডের হিসাব নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে নির্দেশনা ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সহকারী শিক্ষকদের ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর স্কেল প্রদানের বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছিল। অর্থ বিভাগের মতামতে বেতন স্কেল উন্নীত হওয়ার তারিখ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী পরবর্তী ১০ বছরের হিসাব বিবেচনার কথা জানানো হয়।
এ বিষয়টি শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু চাকরিতে যোগদানের তারিখ নয়, সংশ্লিষ্ট পদের বেতন স্কেল উন্নীত হওয়ার তারিখও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিসাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সিনিয়র-জুনিয়র বেতনে ৩০০ টাকার ব্যবধানের অভিযোগ
প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের আবেদনে নতুন বেতন কাঠামোর একটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ ব্যাচের ১১তম গ্রেডভুক্ত একজন সিনিয়র শিক্ষকের ১ জুলাই ২০২৭ তারিখে মূল বেতন দাঁড়াতে পারে ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে, ২০০৯ ব্যাচের ১৩তম গ্রেডভুক্ত একজন জুনিয়র শিক্ষকের মূল বেতন হতে পারে ৩৯ হাজার ১০০ টাকা।
অর্থাৎ সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, চাকরিতে দুই বছর পরে যোগ দেওয়া শিক্ষকটির মূল বেতন সিনিয়র শিক্ষকের চেয়ে ৩০০ টাকা বেশি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এ ব্যবধানের কারণ হিসেবে উচ্চতর গ্রেড, বেতন ধাপ ও নতুন কাঠামোয় বেতন পুনর্নির্ধারণের পদ্ধতিকে সামনে এনেছে সংগঠনটি।
তবে এ হিসাবটি সংগঠনের আবেদনে দেওয়া উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট দুই শিক্ষকের নিয়োগের তারিখ, বর্তমান মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ এবং নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছাড়া এ ব্যবধানের কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নতুন বেতন কাঠামোয় কী পরিবর্তন এসেছে
সরকার ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় আগের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মূল বেতন ও ভাতা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে পুরোনো কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে তাঁদের বর্তমান মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট ও প্রযোজ্য অন্যান্য সুবিধা বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে নিয়োগ পান। নতুন বেতন কাঠামোয় এ গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগে থেকে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাব এক রকম হবে না; তাঁদের চাকরির ইতিহাস ও বর্তমান বেতনের ওপর তা নির্ভর করবে।
বেতন নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জ্যেষ্ঠতার প্রতিফলন চায় সংগঠন
প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের আবেদনে বলা হয়েছে, একই পদে কর্মরত শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণে চাকরির জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কর্মরত সিনিয়র শিক্ষক জুনিয়র সহকর্মীর তুলনায় কম মূল বেতন পাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।
সংগঠনটির মতে, এ ধরনের অসামঞ্জস্য শিক্ষকদের মধ্যে আর্থিক ও মানসিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় উচ্চতর গ্রেডই অনেক শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পথ। তাই উচ্চতর গ্রেডের বিধান বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যাখ্যাগত জটিলতা দূর করা জরুরি।
আবেদনে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ৭ এবং জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর বেতন নির্ধারণ পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সিনিয়র শিক্ষকের চেয়ে জুনিয়র শিক্ষকের মূল বেতন বেশি হওয়ার অভিযোগটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের পক্ষে আবেদনটিতে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনটির সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। আবেদনে তাঁর কর্মস্থল হিসেবে নওগাঁর রানীনগরের ভাটকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটির আশা, পর্যালোচনা কমিটি শিক্ষকদের উত্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বেতন নির্ধারণে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য দূর করতে কার্যকর সুপারিশ করবে। এতে দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষকদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য কমবে।
'পরমাণু চুক্তিতে বাধ্যবাধকতা মানলেও সুফল পায়নি তেহরান'
ইসরায়েলে সরকার গঠনের দায়িত্ব কে পাচ্ছেন, জানা যাবে রোববার
মদিনা লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টার নিন্দা মিসরের
মরিশাসে কাচের বাক্সে চাপা পড়ে ৩ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ৫১ কেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ
ইউটিউবে ভিডিও দেখে চাষ, মরুর দেশের ফল সাম্মাম এখন বাংলাদেশের মাটিতে