শেয়ারবাজার

ওয়াল স্ট্রিটে ধস, ভারতের বাজারে উত্থান কেন?

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১০ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ১৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতনের পরও সেনসেক্সে ১ হাজার ৬০০ পয়েন্টের বেশি উত্থান; বিদেশি বিনিয়োগ, তেলের দাম ও কোম্পানির মুনাফায় ভর করে ঘুরে দাঁড়াল দালাল স্ট্রিট

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধসের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে। তবে বৈশ্বিক বিক্রির চাপের মধ্যেও ব্যতিক্রমীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ভারতের শেয়ারবাজার। শুক্রবার দিনের শুরুতে দরপতন হলেও পরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক শেয়ার কেনার কারণে ঊর্ধ্বমুখী হয় সেনসেক্স ও নিফটি।

দিনের একপর্যায়ে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) প্রধান সূচক সেনসেক্স প্রায় ১ হাজার পয়েন্ট বেড়েছিল। লেনদেন শেষে সূচকটি ১ হাজার ৬০০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে ৮১ হাজার ২৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। অন্যদিকে নিফটি ৫০ সূচকও ২৫ হাজার পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করে।

এই উত্থানের ফলে একদিনেই ভারতীয় শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের সম্পদ প্রায় ১ লাখ কোটি রুপি বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ফিরে আসা, অপরিশোধিত তেলের দাম কমা, কোম্পানিগুলোর ভালো মুনাফা এবং এআই অবকাঠামো খাতে ভারতের তুলনামূলক কম বিনিয়োগ-নির্ভরতা।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেশটির শেয়ারবাজারে প্রথমে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটরা এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং এসব খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধি বিপুল পরিমাণ চিপ, সার্ভার, বিদ্যুৎ ও ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এসব অবকাঠামোর সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হলে পুরো বিনিয়োগশৃঙ্খলের কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় শেয়ার বিক্রি বাড়ে।

এর ফলে নাসডাক সূচকে ১৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় এক দিনের দরপতন ঘটে। নাসডাক ১০০ সূচকের কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে যায়।

অন্যদিকে এআই অবকাঠামো খাতের এসব কোম্পানিতে ভারতের সরাসরি বিনিয়োগ ও বাজার-নির্ভরতা তুলনামূলক কম। ফলে ওয়াল স্ট্রিটের ধসের প্রভাব ভারতীয় বাজারে একই মাত্রায় পড়েনি।

এদিকে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শেয়ারও বাড়ছে। ব্যয়বহুল এআই-নির্ভর কোম্পানির পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ প্রচলিত আইটি সেবা কোম্পানিগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। যদিও এআই ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ভারতের শেয়ারবাজারের উত্থানের অন্যতম বড় কারণ বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (এফআইআই) ফিরে আসা। কয়েক মাস ধরে ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করার পর সম্প্রতি তারা আবার বড় অঙ্কের বিনিয়োগ শুরু করেছেন।

বিনিময় কেন্দ্রের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১৫ হাজার কোটি রুপির ভারতীয় শেয়ার কিনেছেন। প্রায় ছয় বছরের মধ্যে এক দিনে এটিই তাদের সর্বোচ্চ নিট ক্রয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সপ্তাহজুড়েই এই কেনাকাটা অব্যাহত রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে দরপতনের মধ্যেও ভারতীয় বাজারে এক ধরনের সুরক্ষা তৈরি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং এআই খাতে ভারতের তুলনামূলক সীমিত সম্পৃক্ততা দেশটির বাজারকে বৈশ্বিক দরপতনের ধাক্কা থেকে কিছুটা রক্ষা করছে।

ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশটির আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। এ কারণে চলতি বছর তেলের উচ্চমূল্য ভারতীয় শেয়ারবাজারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ ছিল।

সম্প্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে ইরান যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ জোরদার হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এতে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও জ্বালানির দামের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা দেখছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এতে স্পষ্ট হয়েছে, তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

ভারতের কয়েকটি বড় কোম্পানির প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলও বাজারের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।

শুক্রবার মহিন্দ্রা অ্যান্ড মহিন্দ্রার শেয়ারে বড় উত্থান দেখা যায়। কোম্পানিটি দ্বিতীয় প্রান্তিকে সমন্বিত মুনাফায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির খবর দিয়েছে।

এ ছাড়া টাইটান, ইনফোসিস, টিসিএস, এইচসিএল টেকনোলজিস ও ভারতী এয়ারটেলের শেয়ারও বাজারকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

দীর্ঘদিন দরপতনের কারণে বড় কোম্পানিগুলোর অনেক শেয়ার তুলনামূলক আকর্ষণীয় মূল্যস্তরে নেমে এসেছিল। ফলে বিনিয়োগকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ দেখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা যেখানে এআই কোম্পানিগুলোর বিপুল বাজারমূল্য ও ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সেখানে ভারতের বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক প্রতিষ্ঠিত ও ভালো আর্থিক ফল দেওয়া কোম্পানিগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

তবে ভারতের বাজারের এই উত্থান সব ধরনের কোম্পানির মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। সেনসেক্স ও নিফটি বাড়লেও শুক্রবার নিফটি স্মলক্যাপ ২৫০ এবং নিফটি মিডক্যাপ ১০০ সূচক নিম্নমুখী ছিল।

এতে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা নির্বিচারে সব শেয়ার কিনছেন না। বরং তুলনামূলক বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর ওপরই বেশি আস্থা রাখছেন।

এ ছাড়া কয়েকটি উদীয়মান বাজারের তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে পিছিয়ে ছিল ভারতের শেয়ারবাজার। সেনসেক্স ও নিফটি এখনো নিজেদের সর্বোচ্চ অবস্থানের নিচে রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ার ধারা অব্যাহত থাকলে বাজারে আরও পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

এনডিটিভিকে দেওয়া এক বক্তব্যে ভেস্টেড ফাইন্যান্স জানিয়েছে, বৈশ্বিক দরপতনের মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা নিট ক্রেতা ছিলেন। অনেকেই এই দরপতনকে নতুন করে শেয়ার কেনার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। তাদের প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও অর্ডারের সংখ্যাও রেকর্ড গড়েছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের এআই খাতের শেয়ারবাজারে ধস ভারতের বাজারকে সরাসরি একইভাবে বিপর্যস্ত করতে পারেনি। বরং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাবর্তন, তেলের দামের ওঠানামার মধ্যে সাময়িক স্বস্তি এবং বড় কোম্পানিগুলোর ভালো আর্থিক ফল দেশটির শেয়ারবাজারকে নতুন গতি দিয়েছে। তবে তেলের দাম, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এই উত্থান কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনো দেখার বিষয়।

এএইচএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত