ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের হুথিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর এক মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুদ্ধের গতিপথে কোনো নির্ণায়ক পরিবর্তন আসেনি। বরং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে, বাড়ছে প্রাণহানি ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের সংঘাত ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।
গত ৫ অক্টোবর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল পুনর্দখলে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনে সরকারি বাহিনী ঘোষণা দেয়, রাজধানী সানা-সহ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনরুদ্ধার করাই তাদের লক্ষ্য।
২০১৪ সালের শেষ দিকে হুথিরা সানা দখল করার পর থেকে রাজধানীটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে নতুন অভিযান ঘোষণার পর রাজধানীর বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সানার ৪০ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ আহমেদ আলজাজিরাকে বলেন, অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর পরিবারে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কোন পক্ষ শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, সেটি তাঁর প্রধান চিন্তা ছিল না; বরং ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীর আশপাশে কিংবা শহরের ভেতরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই তাঁকে বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল।
অভিযান শুরুর এক মাস পর সানায় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে বিমান হামলা হচ্ছে। অন্যদিকে তাইজ ও লাহিজসহ দক্ষিণ ইয়েমেনের কয়েকটি অঞ্চলে হুথিরা নতুন ভূখণ্ডগত অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান হুথিদের সামরিক ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার মতো সাফল্য এখনো আসেনি।
হুথিদের কৌশলের তিন স্তম্ভে আঘাত
সৌদি ডাইমুমাহ সেন্টার ফর স্টাডিজের প্রধান তুর্কি আল-গোবলান আলজাজিরাকে বলেন, অতীতে সামরিক হামলা মোকাবিলায় হুথিরা ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা, গোপন সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে।
তাঁর মতে, নতুন অভিযান হুথিদের কৌশলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে আঘাত করেছে।
প্রথমত, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থা। হুথিদের সামরিক যানবাহন সচল রাখা, গোলাবারুদ পরিবহন এবং নতুন যোদ্ধা ও রসদ পৌঁছানোর জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের সামুদ্রিক অঞ্চল। এসব এলাকা বিকল্প বহিরাগত সরবরাহপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আল-গোবলান। লোহিত সাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পণ্য ইউরোপে পরিবহনের ক্ষেত্রেও এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
তৃতীয়ত, সানার আশপাশের কয়েকটি উপজাতীয় গোষ্ঠী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে সামরিক সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। এতে এসব গোষ্ঠীর ওপর হুথিদের নির্ভরতা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আল-গোবলানের ভাষায়, এই তিনটি ভিত্তিতে একসঙ্গে আঘাত করা হলে প্রশ্নটি শুধু হুথিদের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা নয়; বরং তারা কতটা দ্রুত সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারবে, সেটিই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মূল্যায়ন, হুথিদের ক্ষয়ক্ষতির গতি তাদের পুনরুদ্ধার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক ফল এনে দিতে পারে।
হতাহত ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাল্টাপাল্টি দাবি
ইয়েমেনের আবাদ স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম মোহাম্মদ বলেন, ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের কারণে হুথিদের বিভিন্ন স্থানে সেনা ও সামরিক সক্ষমতা সরিয়ে নিতে হয়েছে। এতে তারা বিমান হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে।
তাঁর দাবি, বিশেষ করে তাইজ ও ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় বিমান হামলায় হুথিদের অনেক মাঠপর্যায়ের কমান্ডার এবং শত শত যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির পরও হুথিদের ভূখণ্ডগত অগ্রগতি থামেনি। সরকারি বাহিনী সমন্বিত বিমান ও স্থল অভিযান অব্যাহত রাখতে পারলে তাদের এই অগ্রগতি সাময়িক হতে পারে।
গত মাসে ইয়েমেন সরকার দাবি করেছিল, ২৪ ঘণ্টায় তাদের অভিযানে ১ হাজার ৫৪০ জন হুথি যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন। গত সপ্তাহের শেষ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৫ অক্টোবর অভিযান শুরুর পর থেকে ১৬ হাজার ১০০ হুথি সদস্য ও কমান্ডার নিহত বা আহত হয়েছেন।
তবে হুথিরা এসব হতাহতের পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেনি। ফলে সরকারি বাহিনীর দেওয়া সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে সৌদি আরবে প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হুথিরা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলায় দেশটির একাধিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আকাশপথে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
নির্ণায়ক পরিবর্তন ছাড়াই দীর্ঘ হচ্ছে যুদ্ধ
সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা ব্যবস্থাপক ইয়াজিদ আল-জেদ্দাওয়ি মনে করেন, সরকারি বাহিনীর অভিযান গত ৩০ দিনে শক্তির ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।
তাঁর মতে, ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন আর শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গেও এটি জড়িয়ে পড়েছে।
আল-জেদ্দাওয়ি বলেন, ইরান হুথিদের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখে। অন্যদিকে সৌদি আরব গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা সীমিত করতে এবং বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।
তাঁর মতে, সংঘাতের তীব্রতা, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি এবং উত্তেজনা আরও বাড়ানোর প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, দুই পক্ষের অবস্থান ক্রমেই আপসহীন হয়ে উঠছে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর পর থেকে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলাসহ মোট হামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৯৩৯-এ পৌঁছেছে।
সোমবার ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান ও এর লক্ষ্যগুলোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য হলো হুথিদের ‘অভ্যুত্থান’ অবসান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার এবং দেশের পুরো ভূখণ্ডে সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
তাইজ ও আল-জাওফে লড়াইয়ের বিস্তার
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ওয়াদাহ আল-দুবাইশ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাইজে হুথিরা সামরিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এ জন্য তাদের বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে।
তাঁর দাবি, গত এক মাসে হুথিদের ক্ষয়ক্ষতি আগের কয়েক বছরের সম্মিলিত ক্ষতির চেয়েও বেশি।
সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাইজ প্রদেশের ধুবাব জেলা এবং বাব আল-মান্দেবের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনর্দখল করেছে। এ ছাড়া গত রোববার উত্তরাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশের রাজধানী আল-হাজমের পূর্বে কয়েকটি সামরিক অবস্থান ও কৌশলগত উচ্চভূমি পুনর্দখলের দাবি করেছে ইয়েমেন সরকার।
আল-দুবাইশের অভিযোগ, গত এক দশকে বিভিন্ন যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে হুথিরা নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি ও শক্তি বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, গোষ্ঠীটির হুমকি মোকাবিলায় ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনো অটুট
‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর পর থেকে ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা কিংবা সৌদি আরব—কোনোটিই হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বাইরে থাকেনি।
হুথিরা নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটেছে। শাবওয়া প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৭০ জন নতুন সদস্য হুথিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-জেদ্দাওয়ির মতে, ধারাবাহিক হামলা থেকে বোঝা যায়, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনো কার্যকর ও প্রতিরোধক্ষম।
তবে তাঁর প্রশ্ন, হুথিদের হাতে কতটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, শুধু সেটিই বিবেচ্য নয়। বরং তারা এখনো কী ধরনের বহিরাগত সহায়তা পাচ্ছে—গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহযোগিতা, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা অস্ত্রের পুনঃসরবরাহ—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে আল-গোবলানের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাঁর মতে, হুথিদের অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সব সময় তাদের সামরিক শক্তি বা সুসংগঠিত কৌশলের প্রমাণ নয়। স্থলযুদ্ধে চলাচলের সক্ষমতা কমে আসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা দূরপাল্লার হামলার ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রণাঙ্গনে নিজেদের সংগঠন ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির চেষ্টাও এর পেছনে থাকতে পারে।
আঞ্চলিক সংঘাতের ছায়ায় ইয়েমেন
ইয়েমেনের নতুন এই যুদ্ধপর্বে সৌদি আরবের সামরিক ভূমিকা, ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক এবং বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
এক মাসের অভিযানে সরকারি বাহিনী কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনর্দখলের দাবি করলেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। অন্যদিকে ক্ষয়ক্ষতির পাল্টাপাল্টি দাবি, সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বিভিন্ন প্রদেশে নতুন করে লড়াই ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সংঘাতের বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান এখন পর্যন্ত যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করতে পারেনি। বরং ইয়েমেনের এক দশকের বেশি সময়ের সংঘাত নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে—যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষকে।
পাঁচ জাহাজের নাম বদল, ‘জয় বাংলা’ ও জাতীয় চার নেতার নাম বাদ
অবরোধে শ্বাসরুদ্ধ ইয়েমেনের তাইজ, বন্ধ ১২০ হাসপাতাল
৭ শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ খুলবে না, আলোচনাতেও বসবে না ইরান
সামরিক সহায়তা থেকে অংশীদারত্বে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক: নেতানিয়াহু
ইসরায়েলে সরকার গঠনের দায়িত্ব কে পাচ্ছেন, জানা যাবে রোববার