ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনী এই বিপর্যয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অসন্তোষকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, সমঝোতায় পৌঁছানো কিংবা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার মধ্যে কোন পথে এগোবেন—এ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির ৬ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতি, কংগ্রেস, হোয়াইট হাউস এবং রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষণটিতে যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যমটির মূল্যায়নকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় না।
গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ৪ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। সিনেটেও দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন অন্তত ৫৪ এবং প্রতিনিধি পরিষদে তারা অন্তত ৩০টি আসন বাড়িয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরে এই পরিবর্তন হোয়াইট হাউসের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করবে। কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাজেট, আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহির চাপও বাড়তে পারে।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অসন্তোষ এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনের পর রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ৪ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেন, নির্বাচনে দলটির হারের প্রধান কারণ ইরান যুদ্ধ।
ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী সমর্থকদের একটি অংশ এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। তাঁদের অসন্তোষের চারটি প্রধান বিষয় ছিল—ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে ফিরে যাওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পুনর্বিবেচনা করা।
ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে মতপার্থক্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যান্স যুদ্ধকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রশাসনের নীতির সমালোচনায় সরব হয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প নির্বাচনের পরও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে সমর্থন করেছেন।
নির্বাচনের পর সমর্থকদের আস্থা ফেরাতে ভ্যান্স যে চারটি বিষয় সামনে এনেছেন, সেগুলো রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধ বন্ধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্বার্থকে অগ্রাধিকার এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিদেশি সংঘাত এড়িয়ে দেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করছেন।
ভ্যান্সের অবস্থান তাই শুধু যুদ্ধনীতি নিয়ে মতভিন্নতা নয়; এটি রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ভ্যান্স এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মেহের নিউজের বিশ্লেষণে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত বৈঠকে ভ্যান্স ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুর অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব কতটা প্রাধান্য পেয়েছে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিবেচনা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে মেহের নিউজের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভ্যান্সের অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে সমঝোতামুখী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রশাসনের ভেতরে এসব মতপার্থক্যের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ্যে আসেনি।
মেহের নিউজের বিশ্লেষণে ট্রাম্পের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথের কথা বলা হয়েছে।
প্রথমত, ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো। এতে সংঘাত প্রশমনের সুযোগ তৈরি হলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও যুদ্ধের পক্ষে থাকা অংশের সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন তিনি। তাঁরা একে পূর্বঘোষিত লক্ষ্য থেকে সরে আসা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
তৃতীয়ত, বড় ধরনের সামরিক অভিযান ছাড়াই অর্থনৈতিক ও নৌচাপ অব্যাহত রাখা। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নাও আসতে পারে।
ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু করলে তেহরানের অবস্থান বদলাবে কি না, কিংবা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মেহের নিউজের বিশ্লেষণে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন হামলা চালালেই ইরানের আলোচনার অবস্থান বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে এ গোয়েন্দা মূল্যায়নের মূল নথি ও বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণটিতে তুলে ধরা হয়নি।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো, রিপাবলিকানদের মধ্যে মতপার্থক্য, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ভিন্ন অবস্থান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের নীতি ও সামরিক ব্যয় নিয়ে জবাবদিহি চাইতে পারে। ফলে যুদ্ধ পরিচালনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেই প্রেসিডেন্টের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত সব ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না।
এ অবস্থায় ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, সমঝোতায় যাওয়া কিংবা চাপের বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা—কোনোটিই রাজনৈতিকভাবে সহজ সিদ্ধান্ত নয়। ভ্যান্সের বক্তব্য ও নির্বাচনের ফলাফল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে যুদ্ধনীতি নিয়ে নতুন বিতর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মেহের নিউজের মূল্যায়নে, যে সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সামরিক পরিস্থিতির পাশাপাশি মার্কিন ভোটারদের মনোভাব, কংগ্রেসের অবস্থান এবং রিপাবলিকান নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
টু-জি বন্ধের পরিকল্পনা, অকার্যকর হতে পারে বাটন ফোন
শ্বশুরবাড়ির ৬ সদস্যকে হত্যা করে গাড়িতে করে মরদেহ রেখে আসেন বিভিন্ন স্থানে
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস, উধাও ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার
মদিনা লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টার নিন্দা মিসরের
’আমাদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেন, শ্রমিকের কতটাকা বেতন দিতে হয় দিবো'