যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের কাছে পরাজিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। এই নির্বাচনী ধাক্কা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক শক্তি প্রদর্শন, প্রতিপক্ষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরির যে পররাষ্ট্রনীতি ট্রাম্প অনুসরণ করেছেন, তার মূল্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও দিতে হচ্ছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করতে পারছেন না। এবিসি নিউজের একটি এক্সিট পোলের বরাত দিয়ে মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ৩৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ জাতীয় নিরাপত্তা ও শক্তি প্রদর্শনের যুক্তিতে শুরু করা সামরিক সংঘাতের কারণে ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য- সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মতো মূল্য দিয়ে এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়া কতটা যৌক্তিক, তা সমর্থকদের প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা উচিত। তিনি যুদ্ধের অবসান, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। ভ্যান্সের এই অবস্থানকে ট্রাম্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে তাঁর রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, নির্বাচনে পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করলেও ট্রাম্প বলেছেন, সময় পেছনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন। তার এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক ক্ষতির কথা স্বীকার করেও ইরান প্রশ্নে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে তিনি আগ্রহী নন।
ইরান যুদ্ধের ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আর্থিক মাশুলও বড়। মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে পেন্টাগনের হিসাবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার, ধ্বংস বা হারানো সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতিপূরণে ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার এবং সামরিক অভিযান ও সহায়তা কার্যক্রমে প্রায় ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এর বাইরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মার্কিন পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে। অর্থাৎ সামরিক শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নেওয়া নীতি শেষ পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল করেছে।
ট্রাম্পের হাতে লাগাম টানার সুযোগ কংগ্রেসের
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সরকারের পক্ষে সরকারি তহবিল ব্যয় করা যায় না। এই ক্ষমতাকে বলা হয় ‘পাওয়ার অব দ্য পার্স’। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকায় ডেমোক্র্যাটরা সামরিক অভিযান ও বিদেশি সহায়তার অর্থায়নে শর্ত আরোপ, নির্দিষ্ট কর্মসূচির বরাদ্দ সীমিত করা এবং প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারবেন।
এছাড়া প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের শুনানিতে তলব, সামরিক অভিযানের ব্যয় ও সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অর্থায়ন খতিয়ে দেখার সুযোগও তাদের থাকবে। তবে অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা থাকলেই প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলে প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো অকার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন।
২০০৭ সালে ইরাক যুদ্ধের অর্থায়নে শর্ত আরোপের চেষ্টা করেছিল কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বিরোধিতার মুখে সেই উদ্যোগ কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রেসিডেন্টকে চাপে ফেলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ইরান ছাড়াও নানা ফ্রন্টে প্রশ্নের মুখে ট্রাম্প
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি শুধু ইরান ইস্যুতেই সমালোচনার মুখে পড়েনি। লাতিন আমেরিকায় তার নীতি, বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ, ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং ইউক্রেন প্রশ্নে অবস্থানের অসংগতিও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সমালোচকদের মতে, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে অন্য দেশগুলোর ওপর নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিরোধ, বাড়তি ব্যয় এবং মিত্রদের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়াকে এসব নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ক্ষমতা থাকলেও আগের মতো স্বাধীন নন ট্রাম্প
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে তার সাংবিধানিক ক্ষমতাও বহাল থাকবে। কিন্তু এখন থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের নিঃশর্ত সমর্থন পাবেন এমন নিশ্চয়তা আর নেই। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়, ভাইস প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং জনমতের চাপ, সব মিলিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির রাজনৈতিক মূল্য এখন ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরেও অনুভূত হচ্ছে।
কংগ্রেসের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পকে রাতারাতি নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে না পারলেও তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। সামরিক অভিযানের ব্যয় বাড়ানো, প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা হোয়াইট হাউসের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবেন।
এখন প্রশ্ন শুধু ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান নয়; বরং প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে দেশের অর্থ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারেন, তা নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন, নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও পররাষ্ট্রনীতির ভুল সিদ্ধান্তের জন্য তাকে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি
স্ত্রী যদি স্বামীর পাশে না দাঁড়ান, নতুন কাউকে খুঁজুন: কেটি মিলার
চীনা গুপ্তচরের সঙ্গে এনভিডিয়া প্রধানের প্রেমের সম্পর্ক!
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৭ বাংলাদেশি নিহত
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন বিচার বিভাগে পদত্যাগের হিড়িক
মক্কা-মদিনার পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ, হুথিদের হামলার নিন্দা মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের
বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপমুক্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আহ্বান আরাগচির
১২ দিনের যুদ্ধে শত্রুদের ২৬০ বিমান ভূপাতিত: ইরান