হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের ৭ শর্তে সন্তুষ্ট নয় যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে ইরানের দেওয়া সাত শর্তের জবাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে সন্তোষজনক নয় বলে মন্তব্য করেছে তেহরান। এর মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের কাছের একটি ইরানি দ্বীপে হামলার কথা স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে কাতার এবং হরমুজ প্রণালিতে আরও একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সাতটি শর্ত মেনে নিলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের অবসান। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আলোচনায় অগ্রগতির খবর এলেও ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের জবাব তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করেনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের অধিকার ও দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জবাব সন্তোষজনক নয়। তেহরানের সাতটি শর্ত স্পষ্টভাবে ও পূর্ণাঙ্গভাবে বিবেচনা করে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তা হলেই কেবল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।

এর আগে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। উভয় পক্ষই আলোচনার প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে আদান-প্রদানে সহায়তা করছে কাতার।

কেশম দ্বীপে হামলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের

ওয়াশিংটনে মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, ওই দিন ভোরে ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। অভিযানটিকে ‘ছোটখাটো হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, এটি যুদ্ধ নয়।

ট্রাম্প জানান, ইরান প্রায় দুই মাস ধরে ওই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেটির নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং স্থাপনাটি তৈরি হওয়ার পরই হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির কাছের কেশম দ্বীপে হামলাটি হয়েছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, একটি মার্কিন উড়োজাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের গুলিবর্ষণের পর আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে হামলা চালানো হয়েছে।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বুধবার থেকেই ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি থাকার কথা।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ভোট শেষ হওয়ার পর ইরানে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর আগের হুমকি বাস্তবায়ন করতে পারেন, এমন উদ্বেগও বেড়েছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, সম্ভাব্য সামরিক অভিযান স্বল্পমেয়াদি হলেও তীব্র হতে পারে।

মঙ্গলবারও আরও সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, অনেক মানুষকে হত্যা করার ইচ্ছা তাঁর নেই। তবে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ইরানের সঙ্গে চলমান অচলাবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্টির ইঙ্গিত দেন তিনি। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আমরা যা চাই, সবই পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে।’

অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সপ্তাহান্তে দেশটির সামরিক বাহিনীকে যেকোনো হুমকির তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনা না করার পাশাপাশি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করতেও বলেছেন তিনি।

ইরানের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউরোপের দেশগুলো এবং পারস্য উপসাগরের সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কার মধ্যেই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, মঙ্গলবার ওমানের উপকূলীয় গ্রাম লিমাহর উত্তর-পূর্বে প্রায় ১৪ নটিক্যাল মাইল বা ২৬ কিলোমিটার দূরে একটি তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে দুটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে। এতে কেউ হতাহত হননি।

অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, চারটি তেলবাহী জাহাজ নেভিগেশন ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে অনুমোদনহীন পথে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল। এ সময় সেগুলো মাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া আরও দুটি জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে বাহিনীটি।

তবে আইআরজিসির এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ইউকেএমটিওর জানানো ট্যাংকারে হামলার ঘটনার সঙ্গে এসব দাবির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম পার্স টুডের বরাতে আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, বন্দর খামির এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এলইউসিএএস হামলাকারী ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জন মিয়ারশাইমার প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন করে কয়েক দিনের বিমান হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটন কীভাবে তার লক্ষ্য অর্জন করবে। তাঁর আশঙ্কা, ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এক ভিডিও মন্তব্যে তিনি বলেন, ৪০ দিনের বোমা হামলার অভিযান যদি লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে তিন দিনের অভিযান কীভাবে সফল হবে? এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগের ৪০ দিনের বিমান হামলা এবং নতুন করে স্বল্পমেয়াদি অভিযানের পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

মিয়ারশাইমারের মতে, ইরানের পাল্টা জবাবের পর যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতিও বাড়তে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা