ইরান ইন্টারন্যাশনালের অনুসন্ধান

ব্যাংক থেকে পরমাণু স্থাপনা, ইরানে মোসাদ নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি

ইরানের ব্যাংকিং ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একটি বিস্তৃত গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার দাবি করেছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে প্রবেশ, ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহ, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর আর্থিক পথ শনাক্ত এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় নাশকতার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে মেহদি নাদেরি জাহরোমির নাম। ১৯৯৯ সালে টেলিযোগাযোগ ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করা তার প্রতিষ্ঠান তেহরান ইন্টারনেট পরবর্তী সময়ে মোবাইল ও টেলিফোন সেবার বিস্তৃত ব্যবসায় যুক্ত হয়। প্রতিবেদনের দাবি, অর্থের প্রতি নাদেরির দুর্বলতা এবং ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ খাতে তার বিস্তৃত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে মোসাদ ইরানে নিজেদের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে নাদেরির সাবেক সহযোগী হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিয়া নামের এক ব্যক্তির বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। ওই ব্যক্তির দাবি, তিনি ইরানে মোসাদের হয়ে কাজ করতেন এবং নাদেরির সঙ্গে কাজ করার সময় ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ ব্যবহার করে বিভিন্ন সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ পান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিয়ার বক্তব্যের পাশাপাশি চুক্তিপত্র, ব্যাংক-সংক্রান্ত নথি, করপোরেট রেকর্ড ও বিচারিক নথি পরীক্ষা করা হয়েছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর অভিযোগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাদেরির ব্যবসা দ্রুত বাড়ার পেছনে ব্যাংকিং সুবিধা বড় ভূমিকা রাখে। কিয়ার ভাষ্য, বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবহার করে ঋণ, ব্যাংক গ্যারান্টি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নেওয়া হতো। এসব ব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া লেনদেন ও কাগুজে বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও তোলা হয়েছে।

কিয়ার দাবি, নাদেরির কাছ থেকে শেখা এসব আর্থিক কৌশল পরবর্তী সময়ে মোসাদের কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগাতেও ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ইসরায়েল থেকে সরাসরি অর্থ না এনে ইরানের নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই কিছু গুপ্তচরবৃত্তিমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নাদেরির বিভিন্ন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তাকে সরকারি ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব যোগাযোগের বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও প্রতিবেদনে এসেছে।

কুদস ফোর্সের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি

ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে কিয়ার বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, নাদেরির মাধ্যমে তিনি আইআরজিসির কুদস ফোর্সের তৎকালীন কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই যোগাযোগের মাধ্যমে ইরানের টেলিযোগাযোগ খাত এবং কুদস ফোর্সের আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিবেদনটির দাবি, অবৈধ আন্তর্জাতিক কল সংযোগের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গোপন ব্যবস্থা ইরানের বাইরে পরিচালিত হতো এবং এর অর্থ কুদস ফোর্সের আঞ্চলিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো। কিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার তথ্যও পরে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের হাতে যায়।

মালার্দের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিস্ফোরণ

নাদেরির টেলিযোগাযোগ ব্যবসার মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু টেলিযোগাযোগ সুইচে প্রবেশাধিকার পাওয়ার অভিযোগও তুলেছে প্রতিবেদনটি। এর মধ্যে মালার্দ ও বুশেহরের কয়েকটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিয়ার দাবি, মোসাদের নির্দেশে তিনি এসব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি নির্দিষ্ট ফাইল মুছে ফেলেছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণ পরই মালার্দের কাছে বিদগানে আল-গাদির ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

২০১১ সালের ওই বিস্ফোরণে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হাসান তেহরানি মোকাদ্দামসহ অন্তত ২৭ জন নিহত হন। ইরান ইন্টারন্যাশনাল বলছে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও অনুসন্ধানী সূত্র এই বিস্ফোরণের সঙ্গে মোসাদের সংশ্লিষ্টতার দাবি করেছে। তবে কিয়া নিজেও বলেছেন, তার মুছে দেওয়া ফাইলটি বিস্ফোরণের সরাসরি কারণ ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো গোয়েন্দা উদ্দেশ্যে সেটি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা তিনি জানেন না।

পোস্ট ব্যাংকের তথ্য পাওয়ার দাবি

প্রতিবেদনে ইরানের পোস্ট ব্যাংককে ঘিরে আরেকটি গোয়েন্দা কার্যক্রমের অভিযোগও তোলা হয়েছে। কিয়ার দাবি, ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে নাদেরির ব্যবসায়িক সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ পান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে ঘুষের বিনিময়ে ব্যাংক সেপাহর লেনদেন-সংক্রান্ত কয়েক মাসের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। ওই তথ্যের মাধ্যমে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পোস্ট ব্যাংক কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, সে বিষয়ে মোসাদ ধারণা পায় বলে দাবি করা হয়েছে।

এরপর ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র পোস্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি ব্যাংক সেপাহর হয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনে সহায়তা এবং লেনদেনের প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা গোপন করতে ভূমিকা রেখেছিল। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পোস্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

তাজিকিস্তানে ব্যাংক স্থাপনের পরিকল্পনা

প্রতিবেদনে কিয়ার বক্তব্যের বরাতে তাজিকিস্তানে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইরান থেকে মধ্য এশিয়ায় অর্থ স্থানান্তরের একটি বিকল্প পথ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল।

কিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পরিকল্পনার সঙ্গে কুদস ফোর্সের কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন এবং টেলিযোগাযোগ প্রকল্পের আড়ালে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০১২ সালে ইরান ও তাজিকিস্তানের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে টেলিযোগাযোগ ও ব্যাংকিং-সংশ্লিষ্ট একটি চুক্তির উদ্যোগও নেওয়া হয়।

তবে ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনের দাবি, মোসাদের হস্তক্ষেপের কারণে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। আজারবাইজান ও রাশিয়ার অবস্থান পরিবর্তন এবং তাজিক সরকারের ওপর চাপের ফলে পরিকল্পনাটি পরিত্যক্ত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পরমাণু কর্মসূচিতে সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগ

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটার সরঞ্জাম নিয়েও মোসাদের একটি অভিযানের দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞার কারণে সরাসরি সরঞ্জাম সংগ্রহের সুযোগ সীমিত থাকায় মধ্যস্থতাকারী ও বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানে সরঞ্জাম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

কিয়ার দাবি, এ ধরনের একটি সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে দুটি আইবিএম সার্ভার ইরানে পৌঁছে যায়। পরে এগুলো ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছে হস্তান্তর হয়ে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় স্থাপন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের সূত্রের দাবি, সার্ভারগুলো আগে থেকেই কারসাজি করা ছিল এবং সেগুলো থেকে নাতাঞ্জের তথ্য মোসাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে প্রতিবেদনে এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

মোবাইল নেটওয়ার্কেও প্রবেশের চেষ্টা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোসাদের তৎপরতা শুধু ব্যাংকিং ও পারমাণবিক অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরানের মোবাইল অপারেটর তালিয়ার নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের সুযোগ নিয়েও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

কিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, চীনা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে একটি প্রতিষ্ঠান তালিয়ার নেটওয়ার্কের যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তাব দেয়। এর আওতায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের একটি দল ইরানে এসে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো পরিদর্শনও করে।

প্রতিবেদনের দাবি, পরিকল্পনাটি সফল হলে ইরানের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও গভীর প্রবেশাধিকার এবং গ্রাহকদের কল, বার্তা ও অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে পরে মোসাদের এজেন্টের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাকে দ্রুত ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিল হয়ে যায়।

নিজস্ব অর্থেই গোয়েন্দা অভিযান চালানোর দাবি

নাদেরির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর কিয়া মোসাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ না নিয়েও ইরানের ভেতরে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, নাদেরির কাছ থেকে শেখা ব্যাংকিং কৌশল ব্যবহার করে ঋণ, গ্যারান্টি ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে কিয়ার এই বক্তব্যকে মোসাদের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ইসরায়েলি গোয়েন্দা কার্যক্রমের কিছু ব্যয় ইসরায়েলি অর্থের বদলে ইরানের নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দুর্নীতির সুযোগ কাজে লাগিয়েই মেটানো হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছেন।

প্রতিবেদনটির শুরুতে নাদেরি জাহরোমির বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রকাশিত একটি নথি অনুযায়ী, তাকে তেহরান ইন্টারনেটের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত গুপ্তচরবৃত্তি ও মোসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে নাদেরির বর্তমান অবস্থান বা প্রত্যাখ্যানের কোনো বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি।

পুরো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মূল দাবি হলো, ইরানের আর্থিক ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে কাজে লাগিয়ে মোসাদ দীর্ঘ সময় ধরে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করেছিল। এসব দাবির বড় অংশই সাবেক সহযোগী হিসেবে পরিচিত কিয়ার বক্তব্য ও ইরান ইন্টারন্যাশনালের হাতে থাকা নথির ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করা হয়েছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল