গালিবাফের বিরুদ্ধে সংসদীয় নথি কারসাজির অভিযোগ, কট্টরপন্থী নেতার কারাদন্ড

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফকে নিয়ে সংসদীয় নথি কারসাজির অভিযোগ তুলে নিবন্ধ প্রকাশের ঘটনায় কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য হামিদ রায়িসিকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গালিবাফের করা অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া মামলায় সাজা পাওয়ার পর তাকে তেহরানের এভিন কারাগারের ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে বলে ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে।

বিচার বিভাগের সংবাদ সংস্থা মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ ধর্মীয় আদালতের আপিল বিভাগ রায়িসিকে অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। ২৭ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেখানেই তাকে ১০ মাসের সাজা ভোগ করতে হবে।

মামলাটির সূত্রপাত ২০২৪ সালের শুরুর দিকে। তখন রায়িসি সংসদ সদস্য ছিলেন না; তিনি কট্টরপন্থী সাপ্তাহিক ৯ দের প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ওই সময় সংসদীয় নথিতে গালিবাফের কারসাজির অভিযোগ তুলে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সংসদের আইনবিষয়ক প্রতিনিধি ওই নিবন্ধের বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠান।

ওই মামলায় রায়িসির টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওর বিষয়ও ছিল। ভিডিওতে তিনি গালিবাফকে সংসদীয় স্বৈরশাসক বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে ওই মন্তব্যের অভিযোগ থেকে রায়িসি খালাস পান। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সংসদীয় নথিতে গালিবাফের কারসাজির অভিযোগ প্রকাশের ঘটনায়।

রায়িসি দাবি করেছিলেন, নিবন্ধটির শিরোনাম অন্য এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। তবে আদালত তার এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়, সংসদীয় নথিতে কারসাজির অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি।

আদালত একই সঙ্গে ৯ দের প্রথম পাতায় একই ধরনের অক্ষর ও একই আকারের শিরোনাম ব্যবহার করে সংশোধনী প্রকাশের নির্দেশ দেয়। তবে গত দুই বছর ধরে সাপ্তাহিকটি প্রকাশিত না হওয়ায় সেই নির্দেশ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রায়িসিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় নিবন্ধটির জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল বলেও ফার্স জানিয়েছে। তবে তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। তার বক্তব্য ছিল, ক্ষমা চাওয়ার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না এবং নিজের অবস্থানেই তিনি অটল।

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে রায়িসি রায়টিকে বেআইনি ও রাজনৈতিক বলে মন্তব্য করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, এটি যেহেতু আদালতের রায়, তাই তিনি তা মেনে নেবেন। ১০ মাসের সাজাকেও তিনি অতিরিক্ত বলে মনে করেন। তার দাবি, মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগে প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৯১ দিনের সাজা হওয়া উচিত ছিল।

ধর্মীয় ব্যক্তি হওয়ায় রায়িসির মামলাটি সাধারণ আদালতের বদলে বিশেষ ধর্মীয় প্রসিকিউটর কার্যালয় এবং পরে বিশেষ ধর্মীয় আদালতে পরিচালিত হয়।

গালিবাফের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ

তেহরানের বর্তমান সংসদ সদস্য রায়িসি ইরানের কট্টর রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের পরিচিত মুখ। তিনি একসময় পায়দারি ফ্রন্টের সদস্য ছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় আগে দলটির কেন্দ্রীয় পরিষদের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তিনি দল ছাড়েন বলে জানিয়েছেন। তবে দলটির সঙ্গে তার আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা এখনো রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

গালিবাফের সঙ্গে রায়িসির বিরোধ শুধু এই মামলায় সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বেরও প্রতিফলন ঘটেছে এই বিরোধে। রায়িসিসহ কট্টরপন্থী কয়েকজন সংসদ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে সংসদের ওপর গালিবাফের নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তার ভূমিকার সমালোচনা করে আসছেন।

তাদের অভিযোগ, গালিবাফ নেতৃত্বের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সমঝোতার পর এই বিরোধ আরও তীব্র হয়।

রায়িসি অভিযোগ করেন, গালিবাফ এমন একটি সমঝোতাকে সমর্থন করেছেন যার ফলে তেহরান আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারেনি। তার দাবি, ওই সমঝোতা রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের পথ তৈরি করতে পারে। পায়দারি-ঘনিষ্ঠ ও অন্যান্য কট্টরপন্থী সংসদ সদস্যরাও গালিবাফের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন।

পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও বিরোধ

রায়িসির রাজনৈতিক অবস্থান তাকে শুধু গালিবাফের মতো আলোচনাপন্থী রক্ষণশীলদের সঙ্গেই নয়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও সংঘাতে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে পেজেশকিয়ানের অবস্থানের ধারাবাহিক সমালোচক রায়িসি। অতীতেও তিনি পেজেশকিয়ানের রাজনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং তাকে ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুলহাসান বনি সদর-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ১৯৮১ সালে সংসদের মাধ্যমে বনি সদরকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ফলে রায়িসির রাজনৈতিক অবস্থান ইরানের রক্ষণশীল শিবিরের ভেতরকার দুটি ভিন্ন প্রবণতার সংঘাতও সামনে আনছে। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে আগ্রহী রক্ষণশীলরা, অন্যদিকে রয়েছে কট্টরপন্থী অংশ, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ছাড় দেওয়া এবং সামরিক চাপ ব্যবহারের সীমা নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

রায়িসির কারাদণ্ড সেই অভ্যন্তরীণ বিরোধকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। গালিবাফকে নিয়ে একটি পুরোনো নিবন্ধের মামলায় সাজা হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব এখন ইরানের রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ক্ষমতা, সংসদ নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল