অপমানের প্রতিশোধ নিতে তৈরি হয়েছিলো ঢাকার যে রাজপ্রাসাদ

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৪ পিএম

‎পুরান ঢাকার ব্যস্ততা, যানজট আর পুরোনো ভবনের সারি পেরিয়ে টিকাটুলির কে এম দাস লেনে পৌঁছালে হঠাৎ চোখে পড়ে সাদা রঙের নান্দনিক এক প্রাসাদ। নাম তার রোজ গার্ডেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি কেবলই পুরোনো দিনের কোনো অভিজাত বাগানবাড়ি। কিন্তু এই স্থাপনার দেয়াল, বাগান আর প্রাঙ্গণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার সামাজিক জীবন, তৎকালীন অভিজাত সংস্কৃতি এবং উপমহাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়।

‎যে গল্পের শুরু গোলাপ দিয়ে

‎রোজ গার্ডেনের গল্প মূলত শুরু হয় একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার ঋষিকেশ দাসকে ঘিরে। বিংশ শতকের শুরুর দিকে ঢাকার অভিজাত সমাজে বাগানবাড়ি ও জলসার বিশেষ কদর ছিল। সেই সময় নিজের রুচি ও সামর্থ্যের প্রকাশ ঘটাতে ঋষিকেশ দাস গড়ে তোলেন একটি ব্যতিক্রমী বাগানবাড়ি।

প্রায় ১৯৩০-৩১ সালের দিকে টিকাটুলিতে নির্মিত হয় এই দৃষ্টিনন্দন ভবন। এর চারপাশে সাজানো হয়েছিল নানা ধরনের গাছপালা ও গোলাপের বাগান। বিভিন্ন জাতের গোলাপ ও নানা ধরনের গাছপালায় সাজানো হয়েছিল বাগানের বড় একটি অংশ। গোলাপের এই সমৃদ্ধ আয়োজন থেকেই ভবনটির নাম হয়ে যায় ‘রোজ গার্ডেন’।

তবে রোজ গার্ডেনের সৌন্দর্যের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বিলাসিতা ছিল না; ছিল তৎকালীন ঢাকার সামাজিক জীবনেরও একটি চিত্র। বাগান, জলসা, সংগীত ও অতিথি আপ্যায়ন সব মিলিয়ে জায়গাটি একসময় শহরের অভিজাতদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

অপমান থেকে প্রাসাদ নির্মাণের গল্প

‎রোজ গার্ডেনকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি রয়েছে। কথিত আছে, ঢাকার আরেক বিখ্যাত বাগানবাড়ি বলধা গার্ডেনের একটি অনুষ্ঠানে ঋষিকেশ দাস অপমানিত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর নিজের সামর্থ্য ও রুচির স্বাক্ষর রাখার জন্য তিনি আরও জাঁকজমকপূর্ণ একটি বাগানবাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

‎এই গল্পের সব অংশ ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়। তবে এটি রোজ গার্ডেনকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল ও আবেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ স্থাপনাটির নির্মাণশৈলী এবং বিশাল বাগান সত্যিই সে সময়ের ঢাকার প্রচলিত বাড়িঘরের তুলনায় আলাদা ছিল।

স্থাপত্যে ইউরোপীয় ছোঁয়া

‎রোজ গার্ডেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি এর স্থাপত্য। ভবনটির নকশায় ইউরোপীয়, বিশেষ করে গ্রিক স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। সামনের অংশে উঁচু স্তম্ভ, অলংকৃত জানালা, প্রশস্ত বারান্দা এবং ভারসাম্যপূর্ণ নকশা ভবনটিকে আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে।

দোতলা এই ভবনের ভেতরেও রয়েছে পুরোনো দিনের আভিজাত্যের ছাপ। বড় হলঘর, নকশা করা ছাদ, রঙিন কাচ, অলংকরণ এবং প্রশস্ত কক্ষগুলো সেই সময়ের জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করে। দ্বিতীয় তলার বড় জলসাঘরটি ছিল ভবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাদা পাথরের মেঝে ও নান্দনিক ছাদের কারুকাজ ভবনের অভ্যন্তরকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

ভবনের বাইরে ছিল বিস্তৃত বাগান। পাথরের ভাস্কর্য, ফোয়ারা ও শানবাঁধানো পুকুরের সমন্বয়ে পুরো জায়গাটি হয়ে উঠেছিল একটি সাজানো বাগানবাড়ি। আজকের ব্যস্ত নগরীর মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই নকশা পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

‎ঋষিকেশ দাসের হাত থেকে রশীদ মঞ্জিল

রোজ গার্ডেনের জৌলুশ দীর্ঘদিন ধরে রাখা সহজ হয়নি। নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই ঋষিকেশ দাস আর্থিক সংকটে পড়েন। একপর্যায়ে তাকে সম্পত্তিটি বিক্রি করতে হয়।

১৯৩৬ সালের দিকে ভবনটি কিনে নেন খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদ। মালিকানা পরিবর্তনের পর ভবনটির নাম রাখা হয় ‘রশীদ মঞ্জিল’। তবে নতুন নাম বেশিদিন মানুষের মুখে টেকেনি। সাধারণ মানুষের কাছে জায়গাটি ‘রোজ গার্ডেন’ নামেই পরিচিত থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে কাজী পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভবনটি ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’ নামেও পরিচিত হয়েছিল।

অর্থাৎ একটি ভবন তার মালিক বদলের সঙ্গে একাধিক পরিচয় পেলেও মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে স্থায়ী হয়ে থাকল ‘রোজ গার্ডেন’ নামটিই।

যে বাড়িতে রাজনীতির নতুন অধ্যায়

রোজ গার্ডেনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব তৈরি হয় ১৯৪৯ সালে। দেশভাগের মাত্র দুই বছর পর পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে তখন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি পূর্ব বাংলায় মানুষের অধিকার, ভাষা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছিল।

‎এই রাজনৈতিক পটভূমিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্মেলন। সেখান থেকেই গড়ে ওঠে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক।

পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক সংগঠনই নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত হয়। ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এরপর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সংগঠনটির ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‎ফলে রোজ গার্ডেন শুধু একটি স্থাপত্য নিদর্শন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাক্ষণের স্মারক।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিচয়

‎রোজ গার্ডেনের মালিকানা ও ব্যবহার সময়ের সঙ্গে বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় এটি ছিল ব্যক্তিগত বাগানবাড়ি, পরে পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও ভবনটির সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৭০ সালে বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেড ভবনটি ইজারা নেয়।

এ সময় রোজ গার্ডেন শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মারক ছিল না; দেশের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গেও এর যোগাযোগ তৈরি হয়। পুরান ঢাকার অনেক পুরোনো স্থাপনার মতোই সময়ের সঙ্গে এর চারপাশের পরিবেশ বদলেছে, কিন্তু ভবনের মূল ঐতিহাসিক চরিত্র টিকে থেকেছে।

সংরক্ষিত স্থাপনা থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রোজ গার্ডেনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি পুরোনো বাড়ি ধীরে ধীরে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

‎এরপর মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে মালিকানা পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার রোজ গার্ডেন কিনে নেয়। সরকারি হিসাবে ক্রয়মূল্য ছিল ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকা।

‎সরকারের অধীনে আসার পর ভবনটিকে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে রোজ গার্ডেনকে শুধু একটি পুরোনো ভবন হিসেবে নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ আরও দৃশ্যমান হয়।

‎পুরান ঢাকার ভেতরে এক টুকরো অতীত

‎আজকের টিকাটুলি আগের সেই টিকাটুলি নেই। চারপাশে ঘনবসতি, দোকানপাট, যানবাহনের শব্দ আর মানুষের ব্যস্ততা। সেই কোলাহলের মধ্যেই রোজ গার্ডেন যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দেয়।

প্রাসাদের সাদা দেয়াল, পুরোনো স্তম্ভ, প্রশস্ত কক্ষ আর বাগানের বিন্যাস দেখলে সহজেই বোঝা যায় একসময় ঢাকার সামাজিক জীবন কতটা ভিন্ন ছিল। এখানে ছিল অবকাশ, সংগীত, অতিথি আপ্যায়ন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিবেশ। পরে সেই একই জায়গা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।

স্থানীয় এক বাসিন্দা আবদুল করিম (৩২) বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই রোজ গার্ডেন দেখে আসছি। চারপাশের পরিবেশ অনেক বদলে গেছে। এটিকে আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা দরকার।’

একটি স্থাপনার ইতিহাসে এমন পরিবর্তন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রোজ গার্ডেন তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের গল্প নয়; এটি ঢাকার সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি নীরব দলিল।

ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়ার জায়গা

রোজ গার্ডেনের গুরুত্ব শুধু তার পুরোনো দেয়ালে নয়। এর গুরুত্ব নিহিত আছে সময়ের স্তরে স্তরে জমে থাকা স্মৃতিতে। একদিকে ঋষিকেশ দাসের গোলাপবাগান ও অভিজাত জীবনযাপন, অন্যদিকে কাজী পরিবারের মালিকানা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ১৯৪৯ সালের রাজনৈতিক সম্মেলন সব মিলিয়ে রোজ গার্ডেন যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের কয়েকটি ভিন্ন অধ্যায়কে একই ফ্রেমে ধরে রেখেছে।

পুরান ঢাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে শুধু পুরোনো একটি বাড়ি নেই, এর সঙ্গে আমাদের এলাকার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই রোজ গার্ডেনের গুরুত্ব জানে না। তাদের কাছে ইতিহাসটা তুলে ধরা উচিত।’

‎একসময় যে বাগানে গোলাপ ফুটত, সেই জায়গাতেই পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। সেই কারণে রোজ গার্ডেনের পরিচয় শুধু ‘সুন্দর পুরোনো বাড়ি’তে সীমাবদ্ধ নয়।

এটি এমন এক স্থাপনা, যার সামনে দাঁড়ালে একই সঙ্গে দেখা যায় 'ঢাকার পুরোনো নগরজীবন, ঔপনিবেশিক সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, স্থাপত্যের বিবর্তন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।'

ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও রোজ গার্ডানে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ আসেন স্থাপত্য দেখতে, কেউ ইতিহাস জানতে, আবার কেউ পুরান ঢাকার ব্যস্ততার মধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে।

এক দর্শনার্থী বলেন, ‘প্রথমবার রোজ গার্ডেনে এসে ভবনটির স্থাপত্য দেখে বেশ ভালো লেগেছে। বাইরে থেকে যতটা পুরোনো মনে হয়, সামনে দাঁড়ালে এর সৌন্দর্য আরও ভালো বোঝা যায়। তবে দর্শনার্থীদের জন্য আরও গোছানো পরিবেশ হলে ভালো লাগত।’

ইতিহাস অনেক সময় বড় কোনো দুর্গ, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা রাজপ্রাসাদে শুধু লেখা থাকে না। কখনও কখনও একটি বাড়ির বারান্দা, একটি বাগানের পথ কিংবা একটি পুরোনো সভাকক্ষও হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী।

‎টিকাটুলির রোজ গার্ডেন তেমনই একটি স্থান। গোলাপের সৌন্দর্য দিয়ে যার যাত্রা, সময়ের সঙ্গে যার পরিচয় বদলেছে, আর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সঙ্গে যার নাম স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

‎পুরান ঢাকার ব্যস্ততার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই সাদা প্রাসাদ তাই নিছক ইট-পাথরের স্থাপনা নয়। এটি অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি জীবন্ত সেতু, যেখানে একটি বাগানের গল্প এসে মিশেছে একটি শহর, একটি সমাজ এবং একটি দেশের ইতিহাসের সঙ্গে।

 

ওয়াইএ
আরও পড়ুন