ফেলানী হত্যার ১৫ বছর, বিচার দেখার অপেক্ষায় পরিবার

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৫ এএম

কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল বুধবার। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফ সদস্যের গুলিতে নিহত হন কিশোরী ফেলানী খাতুন। ১৫ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় আছে নিহতের পরিবার। 

জানা যায়, বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত ঘেঁষা কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন নুরুল ইসলাম নুরু। অভাবের সংসার ছিল তার। সংসারের টানাপোড়েন ঘোচাতে ঘটনার প্রায় ১২ বছর আগে দেড় বছরের ফেলানী কোলে নিয়ে স্ত্রী জাহানারাসহ অবৈধ পথে যান ভারতে। সেখানে বঙ্গাইগাঁও গ্রামে বসবাস শুরু করেন তারা।

পরে ইটভাটার কাজ করেন নুরু। জাহানারাও মাঝেমধ্যে শ্রমিকের কাজ করতেন। এরমধ্যে ফেলানী হয়ে যায় ১৩ বছরের কিশোরী। তখন বাংলাদেশে ফেলানীর বিয়ে ঠিক করে পরিবারের লোকজন। বিয়ের জন্য মেয়েকে নিয়ে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গাইগাও থেকে রওনা দেন বাংলাদেশে বাড়ি উদ্দেশে। আসার সময় মেয়েকে বিয়ের সাজ পড়িয়ে দিয়েছিলেন মা জাহানারা। ওইদিন সন্ধ্যায় সীমান্তে পৌঁছে দালালদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে কাঁটাতার পাড় করে দেওয়ার চুক্তি হয় তাদের। ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্তের এক বাড়িতে থাকতে দেন দালালরা। 

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে প্রথমে কাঁটাতার পাড় হন বাবা নুরুল ইসলাম। এরপর ফেলানী কাঁটাতার পাড় হতে মই বেয়ে উপরে উঠলে ভারতের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফের এক সদস্য তাকে কাছ থেকে গুলি করলে কাঁটাতারে ঝুলে পড়ে ফেলানীর নিথর দেহ। প্রায় চার ঘণ্টা পর ফেলানীর মরদেহ কাঁটাতার থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ। ময়নাতদন্ত শেষে একদিন পর বিজিবির মাধ্যমে মরদেহ ফেরত দেয় তারা। 

কাঁটাতারেই ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘণ্টা। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়।
 
বিএসএফ এর এ কোর্টে সাক্ষি দেন ফেলানীর বাবা নুরল ইসলাম ও মামা হানিফ। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফ এর বিশেষ কোর্ট। পরে রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনঃবিচারের দাবি জানায় ফেলানীর বাবা। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুর্নঃবিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। রায়ের পরে একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮  সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনা শুরুর আগে শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি এখনো।

ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, 'আমার মেয়ে ফেলানীকে হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেলেও আমি আজ অবধি পর্যন্ত বিচার পেলাম না। আমরা এখনো বিচারের অপেক্ষায় আছি। সীমান্তে আরও মানুষের মৃত্যুর খবর শুনতেছি। আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি জানি সন্তানকে হারানোর বেদনা কতোটা কষ্টের। আমি চাই সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা হোক।

তিনি আরও বলেন, সীমান্তে আর কোনো হত্যা দেখতে চাই না। আমার মেয়েকে হত্যার বিচার হলে সীমান্তে আর কোনো মানুষকে হত্যার সাহস পাবে না বিএসএফ। আমার বয়স বাড়তেছে। আমি জীবিত অবস্থায় আমার মেয়েকে হত্যার বিচার দেখতে চাই।

ফেলানীর ছোট ভাই আক্কাছ আলী জানায়, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। আমার বোনের হত্যার বিচারের জন্য আমার বাবা মা এখনও কান্না করে। আমি ভাই হিসেবে আমার একটাই দাবি আমার বোনের হত্যার বিচার চাই।

প্রতিবেশী শরীফ মিয়া বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর হয়ে গেলেও এখনও সীমান্তে ফেলানী হত্যার বিচার আমরা পাইনি। যে সরকারই আসুক সর্বপ্রথম যেন ফেলানী হত্যার বিচারটা আগে করা হয়। ১৫ বছর ধরে ফেলানী হত্যার মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার বাবা কষ্ট পাচ্ছে। ফেলানী হত্যার বিচার যেন আগে করা হয়।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ফেলানীর মৃত্যু বার্ষিকী নিয়ে কোনো কর্মসূচির নির্দেশনা নেই। নির্দেশনা পেলে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

SN
আরও পড়ুন