রাজনৈতিক কার্যালয় নিয়ে সংঘর্ষ, ছেলের গুলিতে বাবা গুলিবিদ্ধ

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

ময়মনসিংহের ভালুকায় বাবার ‘রাজনৈতিক’ কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় ছেলের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এ সময় দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয় এবং গুলি ছোড়েন ছেলে। বাবা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন আরও একজন। রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের জামিরদিয়া নারিশের গেইট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, খোকা মিয়ার মাথায় গুরুতর আঘাত আছে। রোগীর বর্ণনা অনুযায়ী ভালুকা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পা থেকে গুলি খোলা হয়েছে। রোগীর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ থাকায় আঘাতটি গুরুতর। রাতে রোগীর অস্ত্রোপচার করা হবে। গুলির বিষয়টি দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা কিছু জানাননি। অস্ত্রোপচারের পর বিস্তারিত বলা যাবে।  

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খোকা মিয়া ধানের শীষের প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদের সমর্থক ছিলেন। তার ছেলে তোফায়েল আহমেদ (রানা) ছিলেন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মোহাম্মদ মোর্শেদ আলমের সমর্থক। খোকা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর সন্তান তোফায়েল। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ১০ বছর আগে বিচ্ছেদ হয় খোকা মিয়ার। বিএনপির দুই পক্ষের রাজনীতি করা নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।

উপজেলার নারিশের মোড়ে খোকা মিয়ার একটি কার্যালয় আছে। রোববার বেলা দেড়টার দিকে ওই কার্যালয়টি খোলেন তার ছেলে তোফায়েল। এ নিয়ে বাবা ও ছেলের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ছেলে তোফায়েল পিস্তল দিয়ে তার বাবাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। খোকনকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে চেয়ার–টেবিল ভাঙচুর করা হয়। স্থানীয় ব্যক্তিরা আহত দুজনকে উদ্ধার করে ভালুকা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে পাঠান। পরে খোকা মিয়া ও মো. খোকনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খোকা মিয়া বলেন, ‘আমার বাড়ির কাছে রানা (তোফায়েল) ৭-৮ জন লোক ও অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে এবং যেকোনো অঘটন ঘটাবে খবর পেয়েছিলাম। আমি বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবগত করে লোকজন নিয়ে তাকে আটকাতে যাই। আমি অফিসের সামনে যেতেই আমার পায়ে গুলি করে। সবাই যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আমার পিঠে আরেকটি গুলি করে।’ এ বিষয়ে জানতে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।  

ভালুকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, বাবা-ছেলের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধে আজকের ঘটনা। এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বাবা উপজেলা বিএনপির সদস্য ও এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছেন। ছেলে অন্য পক্ষের হয়ে কাজ করে, শুনছি। বিষয়টি রাজনৈতিক নয়; এ কারণে আমরা এ ঘটনায় বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হইনি।’

আহত খোকা মিয়ার (৫৫) বাড়ি উপজেলার জমিরদিয়া মাস্টার বাড়ি এলাকায়। তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপির সদস্য। আহত অন্যজনের নাম মো. খোকন (৪৫)। তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  

জানা যায়, বেশ কয়েকদিন যাবৎ মোর্শেদ আলমের ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্রকরে প্রতিদিন অজ্ঞাত কয়েক যুবক কারখানার সামনে বিভিন্ন সময় মহরা দিয়ে যায়। মহরার সময় যুবকরা মোর্শেদ আলমকে অশ্লীল গালমন্দ করে ও তাকে ঝুট ব্যবসা ছেড়ে দিতে বলে।

উল্টো, সোমবার (১৬ মার্চ) একই এলাকার লাল মিয়ার ছেলে ইব্রাহিম খলিল বাদী হয়ে মোর্শেদ আলমসহ ৪৯ জনের নাম উল্লেখ্য করে ও দুইশতজনকে অজ্ঞাত আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে মামলার এজার নামীয় আসামি শরিফ হাসান ও মাহবুব মিয়াকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠায় ভালুকা মডেল থানা পুলিশ।

কালার মাস্টার কারখানার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ফরহাদ মিয়া জানান, বরাবরের মতই বিকেলে কারখানা থেকে মোর্শেদ আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এইচ.আর.কে.এম এন্টারপ্রাইজ কারখানা থেকে ঝুট বেরকরতে আসলে স্থানীয় এমপি বাচ্চুর নাম ভাঙ্গিয়ে কিছু যুবক কারখানার গেটের সামনে এসে মাল (ঝুট) বের করতে বাধা দেয়। পরে নিরাপত্তা কর্মীরা তাদেরকে সরিয়ে দেয়।

মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম জানান, তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এইচ.আর.কে.এম এন্টার প্রাইজ প্রায় ২৩ বছর যাবৎ এসকিউ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান (কালার মাস্টার) কারখানায় সুনামের সাথে ঝুট ব্যবসা করে আসছে। রোববার (১৫ মার্চ) কারখানা থেকে মালামাল বের করতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ খোকা মিয়া ও ইব্রাহিম খলিলের নেতৃত্বে স্থানীয় এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নাম ভাঙ্গিয়ে বাধার সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, আমি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ ভালুকা আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি।

মোর্শেদ আলম জানান, সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন উদ্দিন বাচ্চুর নাম ভাঙ্গিয়ে তার লোকজন মোর্শেদ আলমের বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছেন। মোর্শেদ আলম বলেন, একদিকে কারখানা থেকে আমার মাল (ঝুট) বেরকরতে বাধা দিচ্ছে আবার আমার বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দিচ্ছে।

ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জাহিদুল ইসলাম নির্বাচনের পূর্বে উভয় পক্ষের ৪টি ও গত ১৭ মার্চ মোর্শেদ আলমসহ ৫০ নেতাকর্মীর নামে রুজু হওয়া একটি মামলার বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। 

কারখানা থেকে ঝুট বের করতে বাধার কারণ জানতে চাইলে স্থানীয় বিএনপি নেতা খোকা মিয়া বলেন, বাধা দেওয়ার বিষয়টি এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নলেজে আছে। 

তাদের নামে কোনো ওয়ার্ক ওর্ডার আছে কিনা জানতে চাইলে খোকা মিয়া বলেন, বিষয়টি এমপি সাহেব জানেন।

এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু গণমাধ্যমকে বলেন, আমি এসবের কিছুই জানি না। কেউ যদি আমার কথা বলে তাহলে তাকে বলবেন আমি কার কাছে বলেছি এটা যেন ক্লিয়ার করে।

আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত