কেজিবি'র গুপ্তচর থেকে ক্রেমলিনের সর্বময় শাসক, পুতিনের দীর্ঘ রূপান্তরের গল্প

আপডেট : ৩১ মে ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আজ যে কঠোর ও কর্তৃত্ববাদী শাসকের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, ক্ষমতার শুরুতে তিনি ছিলেন একেবারেই ভিন্ন চরিত্রের। পুরোনো ছবিতে দেখা যায়, ক্যামেরার সামনে অস্বস্তিতে থাকা, স্বল্পভাষী ও আড়ালপ্রিয় এক ব্যক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেছেন, যার পুরো রাজনৈতিক পরিচয়ই গড়ে উঠেছে শক্তি, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রতীকে।

শৈশবে টেলিভিশনের জনপ্রিয় সোভিয়েত গুপ্তচর চরিত্রগুলোর প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল পুতিনের। পরে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, সেই টিভি সিরিজ ও চলচ্চিত্রের নীরব, দৃঢ়চেতা গুপ্তচররাই তাকে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি (KGB)-এ যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও আমলা হিসেবে দীর্ঘ সময় তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং পরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি ও তার জনসংযোগ দল খুব দ্রুত উপলব্ধি করেন যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে জনমনে একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি তৈরি করা জরুরি।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বোরিস ইয়েলস্টিন-এর মদ্যপানজনিত বিতর্কের বিপরীতে পুতিনকে উপস্থাপন করা হয় সংযমী, সুস্থ ও নিয়ন্ত্রিত একজন নেতা হিসেবে। জনসমক্ষে তাকে প্রায় সবসময় চা পান করতে দেখা যেত। একইসঙ্গে তিনি যুদ্ধবিমান চালানো, জুডো চর্চা, ঘোড়ায় চড়া এবং কঠিন শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে শক্তিমান ও কর্মক্ষম নেতা হিসেবে তুলে ধরেন।

বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর প্রকাশিত খালি গায়ে ঘোড়ায় চড়া, মাছ ধরা কিংবা প্রকৃতির মধ্যে অভিযানের ছবিগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। সমর্থকদের কাছে এসব ছবি ছিল শক্তিশালী জাতীয় নেতার প্রতীক, আর সমালোচকদের কাছে তা ছিল রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন শ্রোতার কাছে ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে রাশিয়া আর দুর্বল রাষ্ট্র নয়; আর দেশের ভেতরে তিনি নিজেকে ঐতিহ্যগত শক্তিশালী নেতার প্রতিমূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি প্রথমে সেইন্ট পিটার্সবার্গ-এর প্রশাসনে এবং পরে মস্কোয় কাজ করেন। সে সময়ের ছবিগুলোতে তাকে প্রায়ই পেছনের সারিতে দেখা যায়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে দৃশ্যপটের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের ব্যক্তিগত রূপান্তর এবং রাশিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তর একইসঙ্গে ঘটেছে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি ধাপে ধাপে গণমাধ্যম, বিরোধী রাজনীতি এবং সংসদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ান। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্রমশ তার ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের চারপাশে আবর্তিত হতে শুরু করে।

২০১২ সালে আবার প্রেসিডেন্ট পদে ফেরার সময় তার চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। একই সময়ে নির্বাচনের আগে ও পরে হওয়া বিক্ষোভের মুখে তিনি আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর থেকে বিরোধী মত দমনে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ আরও জোরদার হয়।

সমালোচকদের মতে, এই সময় থেকেই পুতিন নিজেকে কেবল রাশিয়ার নয়, বরং বৃহত্তর ঐতিহাসিক মিশনের ধারক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। বিরোধী শিল্পীগোষ্ঠী পুসি রায়োটের-এর সদস্যদের ভাষায়, তিনি নিজেকে রাশিয়ার ত্রাণকর্তা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন।

বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী পুতিন আগের তুলনায় অনেক কম জনসমক্ষে আসেন। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ ও মহামারির পর তার উপস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও তার আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে,  ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এখন পুতিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুদ্ধ তার নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। তবে একইসঙ্গে এই যুদ্ধ তার জন্য বোঝাও হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি তা শেষ করাও রাজনৈতিক ঝুঁকিতে ভরা।

প্রায় ২৭ বছর আগে ক্ষমতায় আসা পুতিন একসময় নিজেকে প্রাণবন্ত ক্রীড়াবিদ ও কর্মমুখী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজকের পুতিনকে অনেকেই দেখেন ক্ষমতা, যুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণের এক জটিল কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়া এক শাসক হিসেবে।

AS
আরও পড়ুন