পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক দুর্গম জনপদ আজও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। আধুনিক সভ্যতার নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এসব এলাকার মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং পানি সংকটের কারণে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়েছে।
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে দেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে চারটি ইউনিট প্রায়ই উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে সোলার বিদ্যুৎ এখন নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। ২০১৯ সালে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের প্রথম গ্রিড-সংযুক্ত সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। প্রায় ৭.৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্পটি ১৯ থেকে ২২ একর জমির ওপর নির্মিত হয় এবং এর ব্যয় ছিল প্রায় ১১১ কোটি টাকা। কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে ২০১৯ সালের মে মাসে এবং বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে কাপ্তাই সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৬ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২ কোটি টাকা। দৈনিক গড়ে প্রায় ২৭ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এই কেন্দ্র।
কাপ্তাই ৭ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, নতুন করে আরও ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পৃথক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পাহাড়ি অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, জলবিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। উৎপাদন আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হলেও এর পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার কারণে সৌরবিদ্যুতের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
এই সাফল্য প্রমাণ করে যে পাহাড়ি অঞ্চলে সৌরশক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হতে পারে। প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে উঠে এসেছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায়ও একই ধরনের সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের যৌক্তিকতা আরও জোরালো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। পাহাড়ের অনাবাদি বা অব্যবহৃত জমিগুলোকে কাজে লাগিয়ে ছোট ও মাঝারি আকারের সোলার পার্ক স্থাপন করা সম্ভব। এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয়ভাবে বিতরণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা যেতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার প্রথমবারের মতো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।
বিদ্যুতের আওতায় এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, পর্যটন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।
পরিবেশবিদদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো সময়ের দাবি। সোলার বিদ্যুৎ কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। কাপ্তাইয়ের সফল প্রকল্পটি তাই দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই বৃহৎ পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ থাকলে পাহাড়ি অঞ্চলেই গড়ে উঠতে পারে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। আর তাতেই বদলে যেতে পারে পার্বত্য জনপদের মানুষের জীবনমান, সৃষ্টি হতে পারে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।
ঝিনাইদহে চাচিকে নিয়ে উধাও ভাতিজা
নজরদারিহীন গড়াই নদী: অবাধে জাটকা শিকার, হাটে প্রকাশ্যে বিক্রি
স্বামী ক্রসফায়ারে নিহতের পর মাদক রাজ্যের ‘রানী’ স্ত্রী