চাঁদপুরে ৯২ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই চিকিৎসক

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৮ এএম

চাঁদপুরের আট উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ের ৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক নেই। কাগজে-কলমে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংযুক্তিতে দায়িত্ব দেওয়া হলেও এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মিলছে না চিকিৎসা সেবা। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও উপজেলা কিংবা জেলা সদরে যেতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকা ৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে ২০টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৭২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা। এজন্য প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে এমবিবিএস চিকিৎসকের পদ বরাদ্দ রয়েছে। তবে পদায়ন করা চিকিৎসকদের অধিকাংশই বর্তমানে সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

শুধু চিকিৎসক নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অন্যান্য জনবলের সংকটও প্রকট। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ৫৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। ফলে ৩৯টি পদই শূন্য রয়েছে। একইভাবে ১৪২টি পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদের মধ্যে কর্মরত ৫৯ জন এবং শূন্য ৮৩টি।

পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের ৯১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮২ জন, শূন্য রয়েছে ৯টি পদ। আর ৫১৩টি পরিবারকল্যাণ সহকারী পদের মধ্যে কর্মরত ৩৩৭ জন। এ পদে শূন্য রয়েছে ১৭৬টি।

জনবলসংকটের পাশাপাশি ওষুধের ঘাটতিও স্বাস্থ্যসেবা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সরকারি এসব কেন্দ্রে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেককেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের সোবহানপুর গ্রামের বাসিন্দা সুমাইয়া আক্তার বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে এমবিবিএস চিকিৎসক পাওয়া যায় না। ফলে চিকিৎসার প্রয়োজনে জেলা সদরে যেতে হয়। দেড় বছরের শিশুকে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাতায়াত করা তাঁর জন্য বেশ কষ্টকর।

সম্প্রতি ওই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে রোগীর উপস্থিতিও কম দেখা যায়। সেখানে আসা কয়েকজন রোগী জানান, জ্বর, সর্দি-কাশির মতো সাধারণ রোগের ওষুধও অনেক সময় পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে তাঁদের বাইরে থেকে কিনতে হয়। কিন্তু অনেক দরিদ্র মানুষের সেই সামর্থ্যও নেই।

বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পাশে অবস্থিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থাও প্রায় একই। স্থানীয় শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, একসময় এলাকার মানুষ নিয়মিত এ কেন্দ্রে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতেন। এখন চিকিৎসক নেই, এমনকি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও নেই। বর্তমানে মাত্র একজন স্বাস্থ্য সহকারী সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসক না থাকলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা আর না থাকার মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকে না। দ্রুত শূন্য পদে লোকবল নিয়োগ এবং সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে। এ কারণে তাঁরা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।

তিনি বলেন, সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া গেলে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকদের তাঁদের নির্ধারিত কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হবে।

চাঁদপুর পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. মোস্তফা কামাল বলেন, জনবলসংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। শূন্য পদ পূরণের জন্য ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিয়োগ শেষ হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জনবলসংকট অনেকটাই কমে আসবে।

ওষুধের সংকটের বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, বর্তমানে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাবেন।

এমইউ
আরও পড়ুন