পাঁচ দশক পর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কমান্ড কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকা কর্মকর্তার ক্ষমতা আইনগতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের নজরদারি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২০ আগস্ট পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৬ এবং ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০-এর একটি সংশোধনী অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে গত বছরের সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস বা সিডিএফ পদটির ক্ষমতা ও কাঠামো আইনগতভাবে নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৬ সালে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টির পর এটিই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ড কাঠামোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। নতুন ব্যবস্থায় পুরোনো চেয়ারম্যান অব জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির পদ বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স গঠন করা হয়েছে। এর প্রধান হয়েছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, যিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের দায়িত্বও পালন করছেন।
পুরোনো ব্যবস্থায় জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান মূলত তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপর তার সরাসরি কমান্ড ছিল না। নতুন আইনে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন সিডিএফ তিন বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকবেন এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
অবসরপ্রাপ্ত এক তিন তারকা জেনারেলের মতে, নতুন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো একটি স্পষ্ট ও আইনসম্মত কমান্ড চেইন তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, এরপর সিডিএফ ও তার সদর দপ্তর, তারপর তিন বাহিনীর প্রধান এবং সর্বশেষ মাঠপর্যায়ের সামরিক ইউনিট।
তবে এই কাঠামো পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে আরও সেনাবাহিনী-কেন্দ্রিক করে তুলবে কি না, তা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
নতুন আইনে পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের প্রধান অবশ্যই সেনাবাহিনী থেকে নিয়োগ পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। জুলাইয়ে জেনারেল সৈয়দ আমের রাজাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা এ পদে যাওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন।
লাহোরভিত্তিক কৌশলগত বিশ্লেষক মাজিদ নিজামির মতে, আগে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ তিন বাহিনীর যেকোনো একটি থেকে পূরণ করা সম্ভব ছিল। নতুন কাঠামোয় সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মনে করেন, নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু স্পষ্টভাবেই সেনাবাহিনী-কেন্দ্রিক। তার আশঙ্কা, তিন বাহিনীর শীর্ষ পদগুলোর অনুমোদন সিডিএফের হাতে থাকায় সময়ের সঙ্গে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে নৌবাহিনী নিয়ে উদ্বেগ বেশি। অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল আহমেদ সাঈদের মতে, পাকিস্তানের সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধ সক্ষমতার সঙ্গে এমন কিছু কারিগরি বিষয় জড়িত, যা নৌবাহিনীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। তার আশঙ্কা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাবাহিনী-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেলে নৌবাহিনীর বিশেষায়িত প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব হারাতে পারে।
পারমাণবিক কমান্ডেও প্রভাব
নতুন আইন পাকিস্তানের পারমাণবিক কমান্ড কাঠামোকেও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সিডিএফ এখন ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির উপ-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে, পাকিস্তান গত বছর আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড নামে একটি পৃথক কমান্ডও গঠন করেছে। এর দায়িত্ব পারমাণবিক কাঠামোর বাইরে থাকা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করা। এতে পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।
তবে পারমাণবিক অস্ত্রের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর কাছেই থাকার কথা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। যদিও বাস্তবে পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিডিএফের বড় ধরনের প্রভাব থাকতে পারে।
বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন
নতুন কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে, তা নিয়ে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও আইনজীবী কর্নেল ইনাম রহিমের মতে, নতুন আইন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষমতা সরিয়ে সামরিক নেতৃত্বের হাতে দিয়েছে। আগে কোনো কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা অবসর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো ও মন্ত্রিসভার প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন ছিল। এখন সেই ক্ষমতা সিডিএফের হাতে ন্যস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
একজন ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আরও বলেন, সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড ফেডারেল সরকারের হাতে থাকার কথা। তার মতে, সিডিএফকে তিন বাহিনীর ওপর অপারেশনাল কমান্ড দেওয়ার ফলে এ সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজ আহসান আহমদ খোখর মনে করেন, সংসদ সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো ক্ষমতা সৃষ্টি করেনি। বরং গত বছরের সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, নতুন আইন সেটিরই আইনগত রূপ দিয়েছে।
তবে পাকিস্তানের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার তুলনা পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। ওই দেশগুলোতে সমপর্যায়ের প্রতিরক্ষা প্রধানের পদ সাধারণত আলাদা এবং ঐতিহাসিকভাবে তিন বাহিনীর মধ্যে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানে সিডিএফ পদটি একই ব্যক্তির হাতে সেনাপ্রধানের দায়িত্বের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। সেনাবাহিনী চারবার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষমতা দখল করেছে এবং তিন দশকেরও বেশি সময় দেশ শাসন করেছে। নতুন আইন সেই দীর্ঘদিনের বাস্তবতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত কাঠামো দিচ্ছে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। সূত্র: আলজাজিরা
ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ
স্টিভ আরউইনের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের শ্রদ্ধা
রাজা তৃতীয় চার্লসের ছবি নিয়ে নতুন নোট আনলো কানাডা
চার মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা তেহরানের
যুক্তরাষ্ট্রকে ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্ত মানতে হবে: হোসেইন তাইয়েব