ছাগলকাণ্ডে ফেঁসে যাওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (শুল্ক ও আবগারি) ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ড. মতিউর রহমান নরসিংদীর শ্বশুরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে প্রথম স্ত্রী ও তৌফিকুর রহমান অর্ণব (ছেলে) ও ফারজানা রহমান ইপসিতার (মেয়ে) নামে-বেনামে অঢেল সম্পত্তি গড়েছেন।
নরসিংদীর মরজালে গড়েছেন দৃষ্টি নন্দন ‘লায়লা কটেজ’ ডুপ্লেক্স বাড়ি ‘লায়লা কানিজ লাকী সড়ক’ ‘লাকী ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ওয়ান্ডার পার্ক ও ইকু রিসোর্ট’। যা নির্মাণে মাজারসহ স্থানীয় অনেকের জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ করেন দুদক, বিভাগীয় কমিশনারের কাছে ভুক্তভোগীরা। যা এখনো সুরাহা না পেয়ে হতাশায় ভেঙে পড়েছেন অনেকেই।
লায়লা কানিজ লাকী উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের মরজালের কফিল উদ্দিন আহম্মদের মেয়ে। লায়লা কানিজ বর্তমানে জেলার রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। জেলা আওয়ামী লীগের দুর্যোগ ও ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক।

শুধু রায়পুরা ও মরজালেই নয়, তার সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। লায়লা কানিজের নির্বাচনী হলফনামা থেকে জানা গেছে, বার্ষিক আয় কৃষি খাত থেকে ১৮ লাখ, বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট-দোকান ও অন্যান্য ভাড়া থেকে ৯ লাখ ৯০ হাজার, শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানতের লভ্যাংশ থেকে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা, উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্মানী বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৫, ব্যাংক সুদ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৯ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা রয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২৩-২৪ অর্থ বছরে ট্যাক্স দেন ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ টাকা। তার প্রায় ৮৫ কোটি টাকার মোট নিট সম্পদ রয়েছে।
সম্পত্তির মধ্যে বসুন্ধরায় জমি ও প্লট, রাজউকে ৫ কাঠা, সাভারে সাড়ে ৮.৫০ কাঠা, গাজীপুরে ৫ কাঠা, গাজীপুরের পূবাইলে ৬. ৬০ শতাংশ ও ২. ৯০ শতাংশ, গাজীপুরের খিলগাঁওয়ে ৫ শতাংশ ও ৩৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, গাজীপুরের বাহাদুরপুরে ২৭ শতাংশ, গাজীপুরের মেঘদুবীতে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, গাজীপুরের ধোপাপাড়ায় ১৭ শতাংশ, রায়পুরায় ৩৫ শতাংশ, ৩৫ শতাংশ ও ৩৩ শতাংশ, রায়পুরার মরজালে ১৩৩ শতাংশ, সোয়া ৫ শতাংশ, ৮.৭৫ শতাংশ, ২৬.২৫ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ, শিবপুরে ২৭ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, শিবপুরের যোশরে সাড়ে ৪৪ শতাংশ, নাটোরের সিংড়ায় ১শ ৬৬ শতাংশ জমি।

ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ৪ শতক জমির মধ্যে প্রথমে দুই শতক জমি ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে কিনে নেন লায়লা কানিজ লাকী। পরে আমি বাড়িতে না থাকায় বাকি দুই শতকসহ মোট চার শতক জমি সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে দখলে নেন। তিন বছর আগে বিভাগীয় কমিশনার দুদক প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অভিযোগ দিই। এখন পর্যন্ত কোনো সূরাহা হয়নি। তাদের অঢেল সম্পত্তি রয়েছে। তাদের সম্পত্তি ও ক্ষমতার বলে আমরা আর কিছু করতে পারিনি। আমার জমি ফেরত চাই।’
মরজাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাজিদা সুলতানা নাসিমা বলেন, ‘লাকী রাজাকার ও বিএনপি পরিবারের মেয়ে। তার চৌদ্দ গুষ্টিতে কেউ আওয়ামী লীগ করেননি। সেও নন পলিটিক্যাল লোক ছিল। লাকীর কারণে আমি নিজেই অনেক সাফার তা সবাই জানে, আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। তাদের অপর্কমের বিরুদ্ধে আমি একাই এখনো যুদ্ধ করে যাচ্ছি। অবৈধ টাকা ও ক্ষমতার বলে সাধারণ মানুষের ইজ্জত সম্মান নিয়ে টানাটানি করে। উনি এখন নব্য আওয়ামী লীগার সেজেছেন। রায়পুরা উপজেলায় আওয়ামী লীগটাকে ভাগ করে দিয়েছেন। তছনছ করে দিয়েছেন পুরো উপজেলাকে।’
ভুক্তভোগী অসুস্থ মো. শাহাবুদ্দিনের ছেলে আশরাফুল আলম মুখলেছ বলেন, ‘আমার বাবার নামে ২০৫ শতক জমি ভুয়া জাল দলিল দেখিয়ে শাহেব আলী ফকিরের মাজারসহ লোকজন নিয়ে রাতারাতি জোরপূর্বক দখল করে নেন। গত ২০২১ সালে ১৭ অক্টোবর ঢাকা সেগুনবাগিচার দুদক কার্যালয়ে মরজালে ওয়ান্ডার পার্ক ও রিসোর্ট নির্মাণ মাজারে ওয়াকফকৃত জমি দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে দখলের বিষয়ে অভিযোগ দেই। আমার সাথে আরও চার-পাঁচ জন তার বিরুদ্ধে দুদকে জমি দখলের অভিযোগ করেছে। মাজারসহ আমাদের জমি ফেরত চাই।’
অভিযুক্ত লায়লা কানিজ লাকী ও তার স্বামী কাস্টমস কমিশনার ড. মতিউর রহমান, তারা সরকারি ১ম শ্রেণির কর্মকর্তা হয়েও রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিয়ে নিজের গঠিত লাকী বাহিনী দিয়ে মরজালের অনেক নিরীহ মানুষের জমি দখল করে মরজাল ওয়ান্ডার পার্ক ও রিসোর্ট নির্মাণ করেন। সে একজন সহযোগী অধ্যাপক হয়ে কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি ব্যবহার করেন। নরসিংদীর মরজালে তার পৈত্রিক ভিটায় নির্মাণ করেছেন ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৩ তলা বিশিষ্ট বাংলো বাড়ি। যেখানে ২ বছর আগে ছিল মাটির একটি ২ চালা ঘর।
এ ছাড়াও গাজীপুরের পুবাইলে রয়েছে আপন ভুবন নামে আরও একটি পার্ক ও রিসোর্ট। এ ছাড়া ঢাকা শহরে রয়েছে তার ১০টি ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তার ও স্বামীর নামে-বেনামে প্রায় হাজার বিঘা সম্পত্তি ও ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। তাদের উপার্জিত অবৈধ অর্থ মানি লন্ডারিং-এর মাধ্যমে আমেরিকা ও কানাডায় পাচার করছে। তার ছেলে-মেয়েরা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের মাধ্যমে আমেরিকায় দামি বাংলো ও দামি গাড়ি ব্যবহার করছে।
মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকীর মুঠোফোন একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।
