ঝিনাইদহে অস্তিত্বহীন ও নিষ্ক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামে রাষ্ট্রীয় অনুদান

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম
ঝিনাইদহে অস্তিত্বহীন, বিলুপ্ত ও নিষ্ক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামে সরকারি অনুদান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অনুদান কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে প্রকৃত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলার সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠকরা।
 
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঝিনাইদহ জেলার ২৬টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ১৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা অনুদান মঞ্জুর করা হয়েছে। গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের (স্মারক নম্বর: ৪৩.০০.০০০০.০০০.১১৬.০২.০০০৪.২৬.২৫) মাধ্যমে এ অনুদান অনুমোদন দেওয়া হয়।
 
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেটের সাংস্কৃতিক মঞ্জুরি (সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান) খাত থেকে এ অর্থ প্রদান করা হবে এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, ঝিনাইদহ বরাবর পেমেন্ট অথরিটি পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অনুদানপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে— অংকুর নাট্য একাডেমী, সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র ও পাঠাগার, ঝিনাইদহ থিয়েটার, বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা (ঝিনাইদহ আঞ্চলিক শাখা), বিহঙ্গ সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র, ভোর হলো, জাগরণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, স্বরলিপি সংগীত চর্চা কেন্দ্র, দীপায়ন সাংস্কৃতিক একাডেমী ও বিপ্লবী বাঘা যতীন থিয়েটারসহ আরও কয়েকটি সংগঠন।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের অভিযোগ, এসব সংগঠনের অধিকাংশই সারা বছর তেমন কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে না। জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক সীমিত কিছু অনুষ্ঠানের বাইরে তাদের দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অনুদানপ্রাপ্ত কয়েকটি সংগঠনের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
 
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কোটচাঁদপুর উপজেলার ‘মিতালী সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ’ বছরে মাত্র একটি-দুটি কর্মসূচি পালন করে। মহেশপুর উপজেলার ‘বনলতা নাট্য সংসদ’ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। অন্যদিকে শৈলকুপা উপজেলার ‘কুমার নাট্যদল’-এর দীর্ঘদিন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এছাড়া শৈলকুপার কবিরপুর এলাকায় ‘বৈশাখী শিল্পী গোষ্ঠী’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একইভাবে গাড়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘গাড়াগঞ্জ থিয়েটার’ নামের কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমেরও সন্ধান মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে, এসব নামসর্বস্ব বা বিলুপ্ত সংগঠনের নাম ব্যবহার করে তদবিরের মাধ্যমে অনুদানের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
শৈলকুপার সংগীতশিল্পী ও শৈলবালা সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি খন্দকার ফারুক হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সাংস্কৃতিক অনুদানের নামে কিছু মানুষের উদরপূর্তি করা হচ্ছে। অনুদানপ্রাপ্ত সংগঠনের তালিকায় এমন সংগঠনের নামও রয়েছে, যেগুলো বহু বছর আগে বিলীন হয়ে গেছে। অথচ তাদের নামেই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছরও একটি বিতর্কিত সংগঠনের নামে ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, যা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও অভিযোগ ওঠে।”
তিনি আরও বলেন, ‘এই অর্থ জনগণের অর্থ। জেলা শিল্পকলা একাডেমি কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কার সুপারিশে এবং কী প্রক্রিয়ায় এসব সংগঠনের নাম সুপারিশ করেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
সচেতন সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি, অনুদান প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বাস্তব কার্যক্রম, সদস্য সংখ্যা, সাংগঠনিক অবস্থা এবং বার্ষিক কর্মসূচি যাচাই করা হোক। পাশাপাশি অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিট ব্যবস্থা চালু ও যথাযথ ভাউচার সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
 
সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অনুদানের আওতায় এনে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
MCH/AHA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত