মাসে দেড় লাখ টাকার বিক্রি, লাভ ৫০-৬০ হাজার টাকা

মাশরুম চাষে বদলে গেছে শাহাজালালের জীবন

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫০ পিএম

ইচ্ছাশক্তি, সঠিক দিকনির্দেশনা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে সফলতা যে হাতের নাগালেই থাকে, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাগান্না ইউনিয়নের বাটিকাডাঙ্গা পূর্বপাড়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা শাহাজালাল। একসময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের স্বপ্ন তাকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস জোগায়।

উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রোজিনা পারভিনের পরামর্শ ও উৎসাহে প্রায় চার বছর আগে চাকরি ছেড়ে শুরু করেন মাশরুম চাষ। মাত্র ২০ হাজার টাকার বিনিয়োগে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ সফল বাণিজ্যিক খামারে পরিণত হয়েছে। নিজের সাবলম্বিতার পাশাপাশি চারজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তিনি এখন এলাকার নতুন উদ্যোক্তাদেরও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

শাহাজালাল বাটিকাডাঙ্গা পূর্বপাড়া গ্রামের ফজল জামাদারের ছেলে। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রথমে মাগুরায় বেসরকারিভাবে মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ নেন। পরে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আওতায় মাগুরায় ১১ দিনব্যাপী ‘অন দ্য জব’ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাশরুম উৎপাদনের দক্ষতা অর্জন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ২০০টি এক কেজি স্পন প্যাকেট দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়।

বর্তমানে তার খামারে প্রায় পাঁচ হাজারটি এক কেজি ওজনের স্পন প্যাকেট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। প্রতিটি স্পন প্যাকেট তৈরিতে প্রায় ২০ কেজি কাঠের গুঁড়া ও ৪ কেজি গমের আটা নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এ উপকরণ দিয়ে প্রায় ৬০টি স্পন প্যাকেট তৈরি করা সম্ভব হয়। প্রতিটি প্যাকেটে একটি করে মাশরুমের বীজ সংযোজনের পর প্রায় এক মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিটি স্পন প্যাকেট থেকে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম মাশরুম পাওয়া যায়।

শাহাজালালের উৎপাদিত মাশরুম বর্তমানে ঝিনাইদহের স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি মাসে তিনি প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মাশরুম বিক্রি করেন। উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে তার মাসিক লাভ হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মাশরুম ২৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।

মাশরুম উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যবহৃত স্পন প্যাকেটও কাজে লাগাচ্ছেন তিনি। উৎপাদন শেষে এসব স্পন প্যাকেট এফওয়াইএম পদ্ধতিতে উন্নতমানের জৈব সারে রূপান্তর করা হয়। এই জৈব সার প্রতি কেজি ১০ টাকা এবং প্রতি মণ ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে একই উপকরণ থেকে মাশরুম ও জৈব সার দুই ধরনের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করছেন শাহাজালাল।

পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই উদ্যোক্তা। বর্তমানে তার খামারে স্থায়ীভাবে চারজন কর্মী কাজ করছেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই খামার স্থানীয় তরুণদের কাছেও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। অনেকেই খামার পরিদর্শন করে মাশরুম চাষ সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন এবং নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

শাহাজালাল বলেন, ‘মানুষের কাছে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আমি মাশরুম চাষ শুরু করি। শুরুতে নানা প্রতিকূলতা ছিল। তবে প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম এবং কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতায় আজ এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে চাই এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইনোকুলেশন ল্যাব স্থাপনের জন্য একটি ল্যামিনার এয়ার ফ্লো এবং জীবাণুমুক্তকরণের জন্য একটি অটোক্লেভ মেশিন প্রয়োজন। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।’

উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রোজিনা পারভিন বলেন, ‘শাহাজালাল একজন পরিশ্রমী, মেধাবী ও সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোক্তা। শুরু থেকেই তাকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি সেই পরামর্শ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সফলতা অর্জন করেছেন। বর্তমানে তার খামারে উন্নত প্রযুক্তিতে মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরকারি সহায়তা পেলে তিনি আরও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করতে পারবেন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। মাশরুম চাষ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ ও বেকারত্ব দূরীকরণে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’

MCH/YA
আরও পড়ুন