দেশের মেইনস্ট্রিম অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক ও প্রকাশকগণ বুধবার (৮ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে তার দপ্তরে সাক্ষাৎ করেন। নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালের বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে তারা আলোচনা করেন।
সাক্ষাৎকালে মন্ত্রীকে জানানো হয়, দেশের মূলধারার গণমাধ্যম হিসাবে অনলাইন পোর্টালগুলো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করছে। জনগণের তথ্যচাহিদা পূরণ ও দ্রুত পৌঁছে দিতে অনলাইন পোর্টালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু নানান কারণে এই গণমাধ্যমের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্পাদকেরা নিবন্ধিত অনলাইন নিউজপোর্টালে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। শীর্ষস্থানীয় ১৩টি নিউজপোর্টালের সম্পাদক-প্রকাশকের এ-সংক্রান্ত একটি যৌথ চিঠি মন্ত্রীর কাছে তুলে দেওয়া হয়।
মন্ত্রী এ সময় সাংবাদিকদের বক্তব্য শোনেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো বজায় রেখে সরকার অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কাজ করছে। একই সঙ্গে এ খাতকে কীভাবে আরও কার্যকর নীতি সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, কেবল অনলাইন সম্পাদক নয়, সবাই বুঝতে পারছেন যে সাংবাদিকতার নামে যা কিছু হচ্ছে সবটাই সাংবাদিকতা নয়। এখানে কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আছে। সরকার আইন প্রয়োগের আগে এমন পদক্ষেপ নিতে চায় যাতে গুজব ও অপতথ্যে জড়িতরা এমনিতেই নিবৃত হয়, তাদের এই খাতে প্রবেশের সুযোগ না থাকে।
সোনালী নিউজের প্রকাশক মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা সময়ের দাবি। তিনি যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।
বৈঠকে জাগো নিউজ ২৪-এর সম্পাদক জিয়াউল হক বলেন, নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে প্রতি বছর পাঁচ হাজার টাকা নবায়ন ফি দিতে হচ্ছে, অথচ অন্যান্য গণমাধ্যমে একবার লাইসেন্স নেওয়ার পর নিয়মিত নবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি এ বার্ষিক নবায়ন ফি ও প্রতি বছর নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানান।
ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ বলেন, নিবন্ধন পাওয়ার পরও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তা নেই। সাংবাদিকতার মান বজায় রাখা এবং পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনলাইন পোর্টালগুলো নানা সংকটে পড়ছে। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরের নামে মিথ্যা ও গুজব প্রকাশের কারণে অনলাইন সাংবাদিকতার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলানিউজ২৪ ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু বলেন, সরকারি বিজ্ঞাপনের সুবিধা শুধু নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। অন্যথায় অন্য গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণ অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে বৈষম্যের সৃষ্টি করবে।
খবর সংযোগের সম্পাদক শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও পেশাদার অনলাইন গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করতে এ ধরনের সহায়তা খুবই প্রয়োজন।
রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু বলেন, নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালকে সরকারি বিজ্ঞাপনের আওতায় আনতে সরকারের অতিরিক্ত কোনো আর্থিক ব্যয় হবে না। শুধু একটি সরকারি আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
ঢাকা মেইল নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল নিবন্ধিত অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার অনুরোধ রাখেন। তিনি বলেন, এর পরে পেজভিউ, নিজস্ব কার্যালয়, জনবলসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন বণ্টনের নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
রাইজিং বিডির নির্বাহী সম্পাদক তাপস রায় বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধিত অনলাইন গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি।
দেশ সমাচার প্রকাশক মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, বর্তমানে অনলাইন সাংবাদিকতা আর প্রচলিত গণমাধ্যমের বিকল্প নয়; বরং এটি মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমেরই অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। সেগুলোর আয়ের নানা খাত ও সরকারের কমবেশি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তারা আর্থিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন।
বৈঠকে সম্পাদকদের পক্ষ থেকে তথ্যমন্ত্রীর কাছে দেওয়া লিখিত প্রস্তাবে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে ২৮২টি নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল রয়েছে এবং আরও কয়েকশ আবেদন প্রক্রিয়াধীন। অন্যদিকে নিবন্ধন ছাড়াই হাজারো ওয়েবসাইট অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে পরিচালিত হওয়ায় সাধারণ পাঠকের পক্ষে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্মের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বিভ্রান্তি বাড়ছে এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া অনলাইন নিউজ পোর্টালের কার্যালয়ের ঠিকানা পরিবর্তনের বর্তমান দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানানো হয়। তারা এ ক্ষেত্রে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের বাধ্যবাধকতা পুনর্বিবেচনারও অনুরোধ জানান।
বৈঠকে উপস্থিত প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ সম্পাদকদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালে সরকারি বিজ্ঞাপন প্রদান, বার্ষিক নবায়ন প্রক্রিয়া বাতিল করা এবং লাইসেন্স ফি বাতিলের মতো বিষয়গুলো মিডিয়া কমিশনের সুপারিশেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে সমাধান আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে কয়েকজন সম্পাদক বিদেশে বা ঢাকার বাইরে থাকায় প্রতিনিধি পাঠিয়ে উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান।
সংবাদপত্র যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রে পরিণত না হয়: মাহমুদুর রহমান
সাংবাদিকদের শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত