টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলে দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের দ্বার। দীর্ঘ বিরতির পর জীবিকার টানে আবারও বনে প্রবেশ করতে শুরু করেছেন জেলে-বাওয়ালিরা। উপকূলীয় জনপদে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে বনে ফিরলেও বনদস্যুদের আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না বনজীবীদের।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা ৩ মাস শেষ হয়েছে।
জেলেদের অভিযোগ, বনদস্যুদের অগ্রিম চাঁদা দিয়েই অনেককে বনে প্রবেশ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে অপহরণের ভয়। ফলে একদিকে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে নিরাপত্তার শঙ্কা দুইয়ের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ নিয়েই সুন্দরবনে যাচ্ছেন তাঁরা।
দীর্ঘদিন পর বনে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে জেলেরা নৌকায় জ্বালানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তুলে নিয়েছেন। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঋণ পরিশোধের আশাও করছেন অনেকে।
সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ায় পর্যটকদের প্রবেশের সুযোগও ফিরেছে। এতে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কর্মচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলেদের জন্য ১৫৫টি পাস এবং একটি পর্যটকবাহী বোটের জন্য পাস দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পাসের সংখ্যা তুলনামূলক কম হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট ২ হাজার ৯৩৮টি বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। এর মধ্যে মাছ আহরণের জন্য ১ হাজার ১৪৮টি, কাঁকড়া আহরণের জন্য ১ হাজার ৭০০টি, গোলপাতার জন্য দুটি, পর্যটকবাহী ট্রলারের জন্য ৭৪টি, লবণাক্ত পানির জন্য একটি এবং মধু আহরণের জন্য ১২টি বিএলসি রয়েছে। এ ছাড়া মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য আরও ৫০০টি ডিঙি নৌকা অনুমোদন পেয়েছে।
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনে অবৈধ প্রবেশ ও শিকার ঠেকাতে অভিযানও চালিয়েছে বন বিভাগ। এ সময়ে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে ৫৫টি মামলা করা হয়েছে এবং ৫৫টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। ৪৪ জনকে আসামি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
একই সময়ে ৩ হাজার ৮৫০ কেজি শামুক, একটি পিকআপ, ১ হাজার কেজি মধু, ২৩০ কেজি সাদা মাছ, ১৩৫ কেজি চিংড়ি, চার বোতল বিষ এবং হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ২৭৮টি ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।
মুন্সিগঞ্জের মৌখালী গ্রামের জেলে শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ তিন মাস পর আজ সুন্দরবনে যাব, ভেবে ভালো লাগছে। মাছ-কাঁকড়া ধরে পরিবারকে খাওয়াতে পারব। তিন মাস খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছি। অনেক টাকা ঋণ হয়েছে। সুন্দরবন থেকে আয় করে সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করব।’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালি গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন সুন্দরবন বন্ধ থাকায় খুব কষ্টে ছিলাম। আজ বন খুলেছে। বন বিভাগের কাছ থেকে পাস নিয়ে বনে যাব। কিন্তু বনদস্যুদের নিয়ে ভয় আছে। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে দস্যুদের আতঙ্ক এই অবস্থায় বনে যেতে হচ্ছে।’
পর্যটকবাহী ট্রলারের মালিক মনির হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকায় তাঁদের ট্রলারগুলো অলস পড়ে ছিল। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পরে ঋণ করে ট্রলার মেরামত করেছেন। পর্যটক বাড়লে তাঁদের আয় বাড়বে এবং সেই অর্থ দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী মোকসেদ হোসেন বলেন, সুন্দরবন বন্ধ থাকায় তাঁদের ব্যবসায়ও মন্দা চলেছে। কারণ এলাকার অনেক মানুষ সুন্দরবননির্ভর জীবিকা চালান। জেলে ও বনজীবীরা বনে যেতে না পারায় তাঁদের আয় বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে পর্যটক না আসায় ব্যবসায়ও প্রভাব পড়েছে। সুন্দরবন খুলে যাওয়ায় এখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরাও সুন্দরবনে আসতে শুরু করেছেন। ঢাকার পর্যটক রহিম বলেন, কয়েকজন বন্ধু মিলে সুন্দরবন ঘুরতে এসেছেন। অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখবেন তাঁরা।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবাইকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে অনুমতিপত্র নিতে হবে। বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের দেওয়া নির্দেশনাও মেনে চলতে হবে। বনজীবীদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ ছিল। তিন মাস পর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদ। তবে জীবিকার প্রয়োজনে বনে ফিরলেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি বনজীবীদের।
চট্টগ্রামে পিস্তলসহ গ্রেপ্তার দুই
মাধবপুরে ভূমি অফিসে জনবল সংকট, ব্যাহত হচ্ছে ভূমিসেবা
দুই শিশুসন্তানকে হত্যা’র পর বাবার আত্মহত্যা
কাবা শরীফকে সাক্ষী রেখে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা যুবকের