দুইবার ভ্যান হারিয়ে নিঃস্ব আব্দুল্লাহ, ঋণের বোঝায় দিশেহারা পরিবার

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম

বয়স ৬৬ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটু স্বস্তির আশায় নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন আব্দুল্লাহ বিশ্বাস। কিন্তু সেই চেষ্টাও যেন বারবার নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে হার মানছে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর দক্ষিণ যদুবয়রা গ্রামের এই বৃদ্ধের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন ছিল একটি ভ্যান। গত বছর বাড়ি থেকে সেই ভ্যান চুরি হয়ে যায়। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে ধারদেনার পাশাপাশি একটি এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নতুন করে আরেকটি ভ্যান কেনেন আব্দুল্লাহ।

ভেবেছিলেন, ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করবেন, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন। ধীরে ধীরে হয়তো সংসারে ফিরবে স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বপ্নও টিকল মাত্র এক বছর।

গত সোমবার দুপুরে লালনবাজার এলাকায় অজ্ঞান পার্টির বিষাক্ত রাসায়নিকের কবলে পড়ে অচেতন হয়ে যান আব্দুল্লাহ। কিছু সময় পর জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখতে পান—তার ভ্যানটি নেই। দুর্বৃত্তরা তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বনটিও নিয়ে পালিয়েছে। এক বছরে দুইবার ভ্যান হারিয়ে এখন কার্যত নিঃস্ব ৬৬ বছরের এই বৃদ্ধ।

ভ্যানের হ্যান্ডেলেই ছিল চারজনের ভরসা

আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের চার ছেলে রয়েছেন। সবাই দিনমজুরের কাজ করেন, তবে তারা আলাদা সংসারে থাকেন। ফলে বৃদ্ধ বয়সেও নিজের সংসারের দায়িত্ব নিজেকেই বহন করতে হয়।

তার সঙ্গে থাকেন স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন, এক নাতি ও এক নাতনি। এই চার সদস্যের সংসারের খাবার জোগাড়ের প্রধান অবলম্বন ছিল আব্দুল্লাহর ভ্যান।

বৃদ্ধ বয়সে অন্য কোনো কাজ করার সামর্থ্যও খুব বেশি নেই। তাই ভ্যানের হ্যান্ডেল ধরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়াই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন।

দিনে তিন থেকে চারশ টাকা আয় হলে কোনো রকমে খাবার জুটত, পাশাপাশি ঋণের কিস্তিও দিতে হতো। অভাবের সংসারে সেই সামান্য আয়ই ছিল অনেক বড় ভরসা। কিন্তু এখন সেই ভ্যানটিও নেই।

ঋণের কিস্তি বাকি, নেই আয়

প্রথম ভ্যানটি চুরি যাওয়ার পর আব্দুল্লাহ ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি। ধারদেনা করে এবং এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় ভ্যানটি কিনেছিলেন।

সেই ঋণের কিস্তি এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই দ্বিতীয় ভ্যানটিও হারিয়ে যাওয়ায় একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে আয়ের পথ বন্ধ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন তিনি।

এখন ভ্যান চালিয়ে আয় করার সুযোগ নেই। ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ তো দূরের কথা, চার সদস্যের পরিবারের নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘরে চুলা জ্বলবে কি না—সেই দুশ্চিন্তাই এখন তাদের নিত্যসঙ্গী।

‘আমরা আর কতবার ভ্যান কিনব?’

স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না মনোয়ারা খাতুন। একবার ভ্যান হারানোর পর কষ্ট করে আবার একটি ভ্যান কিনেছিলেন তারা। এবার সেটিও চলে গেল। নতুন করে আরেকটি ভ্যান কেনার মতো সামর্থ্য কিংবা ঋণ নেওয়ার মতো অবস্থাও তাদের নেই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনোয়ারা বলেন, “এক ভ্যান আমরা গরিব মানুষ কয়বার কিনব? আমাদের তো আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই।”

এই একটি বাক্যেই যেন ফুটে উঠেছে তাদের দীর্ঘদিনের অভাব, সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তা।

শেষ বয়সে একটু বাঁচার স্বপ্নও কি থেমে যাবে?

৬৬ বছর বয়সে আব্দুল্লাহর চাওয়া খুব বেশি কিছু ছিল না। ভ্যান চালিয়ে সামান্য আয় করবেন, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবেন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন—এটুকুই ছিল তার স্বপ্ন।

কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে দুবার ভ্যান হারিয়ে সেই স্বপ্ন এখন চরম অনিশ্চয়তায়। একদিকে বয়সের ভার, অন্যদিকে ঋণের দায়। তার ওপর চার সদস্যের সংসারের খাবারের চিন্তা। সব মিলিয়ে অসহায় এই বৃদ্ধ দম্পতির সামনে এখন যেন কোনো পথই খোলা নেই।

দক্ষিণ যদুবয়রা গ্রামের আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের ঘরের এই কান্না শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি এমন এক অসহায় মানুষের গল্প, যিনি বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াতে চেয়েছেন—কিন্তু প্রতিবারই জীবিকার শেষ অবলম্বনটি হারিয়েছেন।

এখন তার প্রয়োজন সহায়তা—একটি নতুন ভ্যান, অথবা এমন কোনো সহযোগিতা, যা তাকে আবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে।

হয়তো সামান্য সহযোগিতাই ফিরিয়ে দিতে পারে আব্দুল্লাহ ও মনোয়ারা খাতুনের সংসারে চুলার আগুন, মুখে হাসি আর নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত