দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় সাজছে সাতক্ষীরার দুর্গা প্রতিমা

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত সাধারণ দিয়াশলাই কাঠি এবার রূপ নিচ্ছে দেবীর অলংকারে। দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি আর ১০ কেজিরও বেশি রঙিন রেশমি সুতা দিয়ে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মণ্ডপে তৈরি হচ্ছে ব্যতিক্রমী দুর্গা প্রতিমা। প্রতিমার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই নতুন এই আয়োজন দেখতে মণ্ডপে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে সাতক্ষীরাজুড়ে এখন প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও আয়োজকেরা। এর মধ্যেই ব্রহ্মরাজপুরের এই মণ্ডপের ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরি হয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রতিমা তৈরির কাজে চারজন দক্ষ কারিগর এক মাসের বেশি সময় ধরে দিন-রাত কাজ করছেন। দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার কারুকাজ শেষ হওয়ার পর রঙের প্রলেপ দেওয়া হবে। এরপরই পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে প্রতিমাটি।

এদিকে শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়াসহ সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায়ও দুর্গাপূজাকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে, কোথাও চলছে মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জা।

ধর্মীয় উৎসবের আবহের সঙ্গে শিল্পীদের সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে সাতক্ষীরায় জমে উঠতে শুরু করেছে শারদীয় দুর্গোৎসব। আর ব্রহ্মরাজপুরের দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় তৈরি দুর্গা প্রতিমা এবারের উৎসবে যোগ করছে আলাদা মাত্রা।

প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার জানান, ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে একটি কারখানায় দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শেখেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই এবার সাতক্ষীরার মানুষের জন্য ব্যতিক্রমী কিছু করার পরিকল্পনা করেন। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় তাঁরা মোট চারটি প্রতিমা তৈরি করছেন। এর মধ্যে দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় তৈরি প্রতিমাটিই মূল আকর্ষণ।

দিয়াশলাই কাঠি ব্যবহারে অগ্নিঝুঁকি নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে নবদ্বীপ সরকার বলেন, বিশেষ মেডিসিন প্রয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন বাতাসে থাকার কারণে কাঠির বারুদের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে প্রতিমাটিতে অগ্নিঝুঁকি নেই বলে দাবি করেন তিনি।

ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরিতে ব্রহ্মরাজপুরের এই পূজা মণ্ডপের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। গত বছর ধান দিয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল পূজা কমিটি। সেই আয়োজনের সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ এসেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিমাশিল্পীর সঙ্গে আলোচনা করে এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, আয়োজনটি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। শুধু শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাবদ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তবে দর্শনার্থীদের জন্য নতুন কিছু উপহার দিতে পারায় তাঁরা আনন্দিত।

নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রতিমাটি দেখতে প্রতিদিন মণ্ডপে আসছেন অনেকে। দিয়াশলাই কাঠি কীভাবে ধীরে ধীরে দেবীর অলংকারে রূপ নিচ্ছে, তা দেখতে দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়ছে। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন।

স্থানীয় দর্শনার্থীদের ভাষ্য, গত বছর ধানের প্রতিমার পর এবার দিয়াশলাই কাঠির প্রতিমাও নতুনত্ব এনেছে। প্রতিদিনই প্রতিমার অবয়ব ও সাজসজ্জায় পরিবর্তন আসছে। কাজ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে দর্শনার্থীদের আগ্রহ।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ২০২৫ সালে ব্রহ্মরাজপুরে ধানের প্রতিমা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে তৈরি প্রতিমাটিও দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক হয়ে উঠছে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালে সাতক্ষীরা জেলায় ৫৮৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার ৬০০টির বেশি মণ্ডপে পূজার প্রস্তুতি চলছে। ব্রহ্মরাজপুরের ব্যতিক্রমী প্রতিমা দেখতে জেলার বাইরের দর্শনার্থীরাও আসবেন বলে আশা করছেন তিনি।

এমসিএইচ
আরও পড়ুন