লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় আলোচিত সাত বছরের শিশু নন্দিনী রানী হত্যা মামলার রায় মাত্র ছয় বিচারিক কার্যদিবসে ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রকে মৃত্যুদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় তার বাবা রনজিং কুমার রায়কে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং মরদেহ গুমে সহায়তার অভিযোগে বিধানের বাবা রনজিং কুমার ও মা মমতা রানীকে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের নলিনী মোহন বর্মণের সাত বছর বয়সী মেয়ে নন্দিনী রানী গত ১৫ জুন নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে স্থানীয় একটি ভুট্টাখেত থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওইদিন নন্দিনীর বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ বিধান চন্দ্র ও তার বাবা রনজিং কুমার রায়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে ১৬ আগস্ট অভিযোগ গঠন, ২৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ২৩ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করা হয়। মামলা দায়েরের দুই মাস আট দিনের মধ্যে মাত্র ছয় বিচারিক কার্যদিবসে বিচারকাজ শেষ করে রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের নথি অনুযায়ী, বিধান চন্দ্রের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৪০৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় তাকে মৃত্যুদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রনজিং কুমার রায়কে দণ্ডবিধির ৪০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। মরদেহ গুমে সহায়তার অভিযোগে রনজিং কুমার ও মমতা রানীকে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিধান চন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদনসহ পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী লুৎফর রহমান রিপন আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংক্ষুব্ধ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এ. কে. এম. হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, শিশু নন্দিনী হত্যা মামলার রায়ে নিহতের পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর আসামিদের কারাদণ্ড দিয়েছেন। দ্রুত সময়ে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় ঘোষণা করে আদালত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ১৫ জুন দুপুরে বিধান চন্দ্র বিস্কুট খাওয়ানোর কথা বলে নন্দিনীকে নিজ বাড়িতে ডেকে নেয়। পরে তার কানের দুল খুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে দুল ধরে টানাটানির সময় ধস্তাধস্তি হয় এবং নন্দিনীর মাথা টিউবওয়েলের হাতলের সঙ্গে আঘাত লাগে। এতে সে অচেতন হয়ে পড়ে। পরে তার কানের দুল খুলে নেওয়া হয়। বিধানের বাবা-মা ঘটনাটি দেখতে পান বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে নন্দিনীর জ্ঞান না ফেরায় তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গভীর রাতে বাড়ির পাশে ভুট্টাখেতে গর্ত করে তার মরদেহ পুঁতে ফেলা হয়।
পরদিন মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের কাছ থেকে আটক বিধান চন্দ্রকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবি ও আনসার মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হামলায় ১৮ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ প্রশাসনের কয়েকটি যানবাহনও ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় এবং ওসি প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এ ঘটনায় ১৭ জুন আদিতমারী থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম ও উপজেলা পরিষদের স্টাফ আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা এক হাজার থেকে দেড় হাজার গ্রামবাসীকে আসামি করা হয়। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে ফলিমারী গ্রামটি অনেকটা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কাপাসিয়ায় প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষকের ১০৬ পদ শূন্য
কক্সবাজারে ৩১ ভরি সোনার গহনা জব্দ, আটক দুই
জামালপুরে ঘোড়ার মাংস উদ্ধার, আটক পাঁচ