কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিন বন্ধুর চিরবিদায়, গোয়াইনঘাটে শোকের ছায়া

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম

সকালে একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছিল। পরীক্ষা শেষে ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা আর বন্ধুত্বের গল্পে মেতেছিল তিন বন্ধু। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই হাসিমাখা মুখগুলো নিথর হয়ে ফিরে এল পরিবারের কাছে। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা আর স্বপ্ন দেখা সবকিছুরই যেন একসঙ্গে ইতি টানল নির্মম এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।

সিলেটের গোয়াইনঘাট-জাফলং সড়কের জাফলং চা-বাগান এলাকায় রোববার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ, রায়হান আহমেদ (রাহুল) ও জয় আহমদ। 

সোমবার (৬ জুলাই) পৃথক জানাজা শেষে নিজ নিজ এলাকার সামাজিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।

তিন বন্ধুর জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের ঢল নামে। স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক, প্রতিবেশী সবার চোখেই ছিল অশ্রু। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

নিহতদের মধ্যে সাকিব আহমদের জানাজা রোববার বাদ এশা জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। 

সোমবার (৬ জুলাই) বেলা ১১টায় ছৈলাখেল অষ্টম খণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে রায়হান আহমেদ (রাহুল)-এর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন বাদ জোহর লাখেরপাড় গ্রামের হামিদ আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জয় আহমদের জানাজা শেষে তিনজনকেই নিজ নিজ এলাকার সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তিনজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা, ঘুরতে বের হওয়া কিংবা অবসর কাটানো সবখানেই তারা ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, মৃত্যুর পথেও যেন তারা একসঙ্গেই পাড়ি জমাল।

সাকিবের বাবা মহরম মিয়া কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে খুব শান্ত স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন। বাবার কাঁধে সন্তানের মরদেহ যে কত ভারী, যার সন্তান হারিয়েছে একমাত্র সেই বুঝবে।’

রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, ‘ছেলেটা সব সময় হাসিখুশি থাকত। সকালে পরীক্ষা দিতে বের হয়েছিল, কিন্তু ফিরল লাশ হয়ে। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘তিন বন্ধু সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। আল্লাহ তাদেরও একসঙ্গেই নিয়ে গেলেন। সবাই তাদের জন্য দোয়া করবেন।’

তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শিক্ষকদের ভাষ্য, তিনজনই ছিল মেধাবী, ভদ্র ও প্রাণবন্ত। সহপাঠীরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, কয়েক ঘণ্টা আগেও যাদের সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, গল্প করেছে, তারা আর কখনো শ্রেণিকক্ষে ফিরবে না।

স্থানীয়রা জানান, গোয়াইনঘাটসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অনেকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালায়। ফলে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া এবং লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা যাতে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে শিক্ষকদেরও আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা শুধু তিনটি কিশোর প্রাণই কেড়ে নেয়নি; মুহূর্তের মধ্যে তিনটি পরিবারের স্বপ্ন, অসংখ্য সহপাঠীর হাসি আর একটি জনপদের আনন্দও স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে তিন বন্ধু একসঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনেছিল, শেষ বিদায়টাও হলো তাদের প্রায় একই সময়ে। গোয়াইনঘাটের মানুষের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত এমন প্রাণহানি হলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ হবে?

MCH
আরও পড়ুন