সমকামিতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা, বরখাস্ত হলেন সেনেগালের প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

গত কয়েক মাস ধরে চলমান তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে পদ থেকে অপসারণ করে পুরো মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন সেনেগালের প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে।

গতকাল শুক্রবার রাতে এক আকস্মিক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিপুল বৈদেশিক ঋণের চাপে থাকা পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটিতে সরকারের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই নাটকীয় ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই এক ভাষণে পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন সোনকো। তিনি অভিযোগ করেন, ‘স্বৈরাচারী’ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বিশ্বজুড়ে সমকামিতা ‘চাপিয়ে দেওয়ার’ অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, সমকামিতার অপরাধে শাস্তি আরও কঠোর করতে সেনেগালে সম্প্রতি একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।

এই আইন পাসের পর বিশেষ করে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে আসা সমালোচনার জবাবে সোনকো বলেন, "তারা যদি এই পথ (সমকামিতা) বেছে নেয়, সেটি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে আমাদের তাদের কাছ থেকে কোনো জ্ঞান বা শিক্ষা নেওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।" সোনকোর এই বিতর্কিত মন্তব্যের পরপরই তাঁকে বরখাস্তের আদেশ আসে।

প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কর্মকর্তা ওমর সাম্বা বা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ওই সরকারি অধ্যাদেশটি পাঠ করে শোনান। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ফায়ে প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, যার ফলে পুরো মন্ত্রিসভার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। তবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন—সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

পদ হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে সোনকো লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আজ রাতে আমি কুয়ের গরগুইয়ে শান্তিতে ঘুমাব।’ (কুয়ের গরগুই হলো রাজধানী ডাকারে অবস্থিত সোনকোর নিজস্ব এলাকা)।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মধ্যরাতের পর সোনকো যখন তাঁর নিজ বাসভবনে পৌঁছান, তখন সেখানে শত শত অনুসারী ও সমর্থক তাঁকে স্বাগত জানাতে ভিড় করেন।

উল্লেখ্য, মূলত ওসমান সোনকোর তুমুল জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই প্রেসিডেন্ট ফায়ের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত হয়েছিল। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সোনকোরই রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার কথা থাকলেও একটি মানহানির মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় তিনি ভোট লড়ার যোগ্যতা হারান। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় সোনকো ফায়েকে নিজের চেয়েও নীতিবান আখ্যা দিয়ে তাঁর পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ফায়েকে ভোট দেওয়া মানে তাঁকেই ভোট দেওয়া।

এক সময় ফায়ের রাজনৈতিক গুরু বা মেন্টর হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরে। দুজনে মিলে ‘পাস্তেফ পার্টি’ গঠন করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে দুর্নীতি দূর ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথম ধাপেই জয়ী হয়েছিলেন। সেনেগালের যুবসমাজের মধ্যে সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের বিরোধী এবং প্যান-আফ্রিকাপন্থী অবস্থানের কারণে সোনকো অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রেসিডেন্ট ফায়ের হাতে থাকায় তিনি এক অধ্যাদেশেই প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেন।

দীর্ঘদিন ধরেই দুজনের এই বিরোধ প্রকাশ্যে আসছিল। মে মাসের শুরুতে এক টিভি সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ফায়ে দলের ভেতর সোনকোর একক আধিপত্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, "যত দিন তাঁর ওপর আমার আস্থা থাকবে, তত দিনই তিনি এই পদে আছেন। আস্থা হারালে নতুন প্রধানমন্ত্রী আসবেন।" অন্যদিকে সোনকোও ফায়ের বিরুদ্ধে সংকটে তাঁকে রক্ষা না করার এবং নেতৃত্বের ব্যর্থতার পাল্টা অভিযোগ তুলেছিলেন।

২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই জোট সরকারকে পূর্ববর্তী প্রশাসনের রেখে যাওয়া বিশাল ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, সেনেগালের বর্তমান ঋণ তাদের মোট জিডিপির ১৩২ শতাংশে ঠেকেছে, যা সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তবে আশার কথা হলো, গত মাসেই দেশটির পার্লামেন্টে একটি নতুন আইন পাস হয়েছে, যা মানহানির মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে ২০২৯ সালের পরবর্তী নির্বাচনে সোনকোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইনি পথ এখন উন্মুক্ত। সূত্র: এএফপি

YA
আরও পড়ুন