সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বিরুদ্ধে নতুন করে সরব হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শনিবার (৯ মে) দিবাগত মধ্যরাতে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’-এর দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলের বাইরে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। রাত ১১টার পর শুরু হওয়া এই আন্দোলন গভীর রাত পর্যন্ত চলে এবং একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা কলেজের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ফেলেন।
একদিকে ছাত্রসংগঠনগুলো সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করছে, অন্যদিকে অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মহলে এই রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধে’র দাবিতে মানববন্ধন হয়, যেসব কর্মসূচির নেতৃত্বে থাকা অনেকেই পরে শিবিরের নেতৃত্বে এসেছে।

নাছির বলেন, ‘তিতুমীর কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেলসহ অনেক জায়গায় এটি ঘটেছে। তিতুমীরে যিনি আন্দোলন করেছেন, তিনি সেখানকার শিবিরের সভাপতি হয়েছেন। রাজশাহী মেডিকেলে ‘নো পলিটিক্স ইন ক্যাম্পাস’ আন্দোলনের নেতা হয়েছেন সেখানকার শিবিরের সভাপতি। এখন ইডেনেও সেই একই খেলা শুরু হয়েছে।’
পল্টা দাবি তুলে ছাত্রদলকে দোষারোপ করে ইসলামি ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘ছাত্রদলের ‘নোংরা রাজনীতি’র জন্যই শিক্ষার্থীরা রাজনীতি বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। ইডেনে ১৬-১৭ বছর ধরে তাদের নেতারা সিট দখল করে রেখেছে। সেগুলো শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সেখানে শিবির নেই। আর আমরা চাই ছাত্র রাজনীতি থাকুক। তবে একটা কোড অব কন্টাক্ট থাকতে হবে যে ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতি কেমন হবে।’
ছাত্রশিবিরের সভাপতির দাবি, ছাত্রদলের ‘‘নোংরা রাজনীতি’র খেসারত পুরো ছাত্ররাজনীতির ওপর এসে পড়ছে এবং এ জন্য শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছে।’’
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ না করে চাঁদাবাজি, স্ট্যান্ড দখল, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারি ও নিষিদ্ধ লীগকে কমিটিতে পুনর্বাসনসহ সারা দেশে কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘর্ষের কারণে শিক্ষার্থীরা আবার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আবার রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের স্লোগান উঠেছে। এর দায় সম্পূর্ণ ছাত্রদলকেই নিতে হবে।’
অভিভাবক, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ‘শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধের দাবির কয়েকটি কারণ জানা গেছে। যেমন—
১. সম্প্রতি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, মারামারি, চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনা বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, দলীয় স্বার্থে ছাত্রসংগঠনগুলো তরুণদের অস্ত্র হাতে তুলে দিচ্ছে। ফলে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
২. ছাত্ররাজনীতির নামে ক্লাস বর্জন, হল অবরোধ, সড়ক অবরোধ—এসব কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা অসম্ভব করে তুলছে। পরীক্ষা পেছানো, সেশন জট, ডিগ্রি অর্জনে দীর্ঘসূত্রতা—এ অবস্থায় অভিভাবক ও শিক্ষকরাই নিষিদ্ধের পক্ষে সোচ্চার হচ্ছেন।
৩. অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপাচার্য ও প্রশাসন ছাত্রসংগঠনগুলোর দাপটে দুর্বল অবস্থানে থাকেন। পুলিশ বা প্রশাসন অনেকে ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে চান না—উল্লেখ্য, এপ্রিলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারির ঘটনায় প্রশাসনের ‘নীরবতা’ নিয়ে শিক্ষক সমিতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। নিষিদ্ধ করলে প্রশাসনের হাত শক্ত হবে বলে মনে করছেন অনেকে।
৪. জরিপে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী গোপনে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে। তারা বলেন, ‘আমরা পড়তে আসি, পিটুনি খেতে নয়।’ তবে কেউ কেউ ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে মত দেন না।
৫. হাইকোর্ট ইতিমধ্যে এক রিটের শুনানিতে মন্তব্য করেছে—‘ছাত্ররাজনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো নয়’। যদিও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, তবে আইনজীবী ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, সরকার চাইলে সংসদে আইন পাস করে এটি বন্ধ করতে পারে।
৬. অনেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতার পক্ষে। যেমন: ক্লাসরুমে কোনো রাজনীতি নয়, হলের বাইরে সংগঠনের অফিস রাখা যাবে না, নির্বাচনে প্রার্থী হতে ন্যূনতম উপস্থিতি ও জিপিএর শর্ত। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না—তাই নিষিদ্ধের দাবি বাড়ছে।
শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চার জায়গা, রাজনীতির ময়দান নয়—এমন বক্তব্য এখন অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলছে। যত দিন সহিংসতা ও পড়াশোনার ক্ষতি চলবে, নিষিদ্ধের দাবি তত বাড়বে। সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত একটি স্পষ্ট নীতি নিতে হবে—হয় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, নয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ। শিক্ষার্থীদের স্বার্থই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
মধ্যরাতে ইডেন মহিলা কলেজ উত্তপ্ত, কী ঘটেছিল
মধ্যরাতে বিক্ষোভে উত্তাল ইডেন মহিলা কলেজ