জনপ্রিয় তারকা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৭ এএম

বিশ্বখ্যাত টেলিভিশন সিরিজ ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ এবং ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে কোটি দর্শকের মন জয় করা ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৬ বছর। বুধবার (২৮ অক্টোবর) লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, স্ত্রী সানি ওজেলের সান্নিধ্যে শেষ সময় কাটিয়েছেন স্টুয়ার্ট। আলঝেইমার রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর অল্প সময়ের অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

২০১০ সালে নাট্যকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। অভিনয়জগতে স্টুয়ার্টের যাত্রা শুরু ১৮ বছর বয়সে। ১৯৬০-এর দশক থেকে রয়্যাল শেক্‌সপিয়ার কোম্পানির সদস্য হিসেবে মঞ্চে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন তিনি। তবে ৪৭ বছর বয়সে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ সিরিজে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত প্রচারিত সিরিজটিতে ক্যাপ্টেন জ্যঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয় করেন স্টুয়ার্ট। তাঁর মুখে ‘মেক ইট সো’ সংলাপটি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সিরিজটির সাত মৌসুমে ১৭৬টি পর্ব ছাড়াও একাধিক ‘স্টার ট্রেক’ চলচ্চিত্রে এই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ২০২০ সালে ৭৯ বছর বয়সে আবারও ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজে চরিত্রটিতে ফিরে আসেন।

শুরুতে ‘স্টার ট্রেক’-এ অভিনয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন স্টুয়ার্ট। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহ-অভিনেতা ইয়ান ম্যাককেলেন তাঁকে মঞ্চনাটকেই মনোযোগী থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত চরিত্রটি গ্রহণ করেন তিনি। ২০২২ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টুয়ার্ট বলেছিলেন, সিরিজের সাত মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গে জ্যঁ-লুক পিকার্ড ও তাঁর নিজের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য ক্রমেই কমে এসেছিল। নিজের বিশ্বাস ও অনুভূতির অনেক কিছুই চরিত্রটির মধ্যে তুলে ধরেছিলেন তিনি।

‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন স্টুয়ার্ট। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘এক্স-মেন’ সিনেমায় হুইলচেয়ারে চলাচলকারী মিউট্যান্ট অধ্যাপক চার্লস জেভিয়ার বা প্রফেসর এক্স চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আরেকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ফ্র্যাঞ্চাইজির অংশ হন তিনি। এই সিরিজের কয়েকটি ছবিতে ইয়ান ম্যাককেলেনের সঙ্গে অভিনয় করেন, যিনি ম্যাগনেটো চরিত্রে ছিলেন।

প্রথমে এই চরিত্রেও অভিনয় করতে আগ্রহী ছিলেন না স্টুয়ার্ট। তাঁর ধারণা ছিল, এটি ‘স্টার ট্রেক’-এর মতোই আরেকটি কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক কাজ হবে। তবে নির্মাতাদের আশ্বাসে রাজি হন। পরে ২০০২ সালের ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’সহ মার্ভেলের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে কাজ করেন তিনি। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়েও অংশ নিয়েছিলেন স্টুয়ার্ট। আগামী ডিসেম্বরে মুক্তির কথা রয়েছে ছবিটির।

তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে মার্ভেল স্টুডিওস। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি স্টুয়ার্টকে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, উদার সহযোগী ও প্রকৃত ভদ্রলোক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

দারিদ্র্য থেকে বিশ্বখ্যাতির পথে

১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফেরার পর তাঁর বাবা মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং মানসিক আঘাতজনিত সমস্যায় ভুগতেন। স্টুয়ার্টের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা মায়ের ওপর শারীরিক নির্যাতন করতেন। ছোটবেলায় মাকে রক্ষা করতে বাবা ও মায়ের মাঝখানে দাঁড়ানোর স্মৃতিও একাধিকবার তুলে ধরেছেন তিনি।

১২ বছর বয়সে এক শিক্ষক তাঁকে শেক্‌সপিয়রের ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর অভিনয় তাঁর কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে চুল পড়তে শুরু করে এবং ১৯ বছর বয়সে পুরোপুরি টাক হয়ে যান তিনি। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে থাকলেও পরে নিজের এই বৈশিষ্ট্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন।

‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন পিকার্ড চরিত্রটি মূল সিরিজের ক্যাপ্টেন জেমস টি কার্কের চেয়ে ভিন্নভাবে নির্মিত হয়েছিল। উইলিয়াম শ্যাটনার অভিনীত কার্ক ছিলেন অনেক বেশি দুঃসাহসী; অন্যদিকে পিকার্ড ছিলেন চিন্তাশীল, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও গম্ভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

সিরিজের প্রথম দিকে সহশিল্পীদের সঙ্গে কিছুটা কঠোর আচরণের কথাও স্বীকার করেছিলেন স্টুয়ার্ট। ২০২৩ সালে দ্য নিউ ইয়র্কারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, শুটিং সেটে সবাইকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সহশিল্পীরা তাঁকে কাজের পাশাপাশি আনন্দ করার গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি আরও স্বতঃস্ফূর্ত হতে শিখেছিলেন বলে জানান।

প্রথম দুই মৌসুমে পিকার্ড চরিত্রে নিজের অভিনয় নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না স্টুয়ার্ট। তাঁর মতে, তখন চরিত্রটি ছিল বেশ কর্তৃত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ও অন্য কিছু মানবিক বৈশিষ্ট্যের ঘাটতি ছিল। পরবর্তী মৌসুমগুলোতে অভিনয়ে সেই উন্নতি এসেছে বলে মনে করতেন তিনি।

২০১০ সালে বাকিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে নাইট উপাধি গ্রহণ করেন স্টুয়ার্ট। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ব্রিটিশ অভিনেতা লরেন্স অলিভিয়ে, জন গিলগুড ও অ্যালেক গিনেস ছিলেন তাঁর আদর্শ। তাঁদের মতো সম্মানিত ব্যক্তিদের কাতারে জায়গা পাওয়া তাঁর পেশাজীবনের অন্যতম বড় অর্জন।

ব্যক্তিজীবনে তিনবার বিয়ে করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তাঁর দুই সন্তান রয়েছে। ২০১৩ সালে মার্কিন সংগীতশিল্পী সানি ওজেলকে বিয়ে করেন তিনি। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান।

সূত্র: রয়টার্স

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত