সেন্সরশিপকে অগ্রাহ্য করে বানানো একটি ইরানি চলচ্চিত্র গত সপ্তাহে ইউটিউবে মুক্তি পাওয়ার পর যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা নির্মাতাদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। ‘বিদাদ’ ছবিটি সীমা লঙ্ঘন করেছে কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে বরং দর্শকদের বেশি আগ্রহ, ছবিটি ইরানের বাস্তবতাকে যথেষ্ট গভীরভাবে তুলে ধরতে পেরেছে কি না।
সোহেইল বেইরাগির চতুর্থ এই পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অনেক দর্শক বহু বছর পর প্রথমবারের মতো পরিচিত ইরানকে পর্দায় দেখতে পেয়েছেন, বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়া নারী, নারী-পুরুষের আলিঙ্গন, ভূগর্ভস্থ সংগীত, আর এক তরুণী গায়িকা, যিনি নিজের কণ্ঠস্বর চেপে রাখতে রাজি নন। তবে অন্য অংশের দর্শকদের মূল্যায়ন প্রায় বিপরীত। তাদের মতে, ছবিটি যে সমাজকে চিত্রিত করতে চেয়েছে, তার চেয়ে বরং পিছিয়ে আছে। মাদক, মদ্যপান, যৌনতা আর ভাঙা সম্পর্কের ভারে মূল বিষয়বস্তু থেকে মনোযোগ সরে গেছে বলেও অভিযোগ তাদের।
‘ছবিটি দেখেছি। গল্পটা গভীরভাবে নাড়া দেয়, আর সমাজ হিসেবে আমরা যা মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তারই প্রতিফলন এটি,’ আয়রন ইন্টারন্যাশনালের ইনস্টাগ্রাম পেজে এক ব্যবহারকারী লেখেন। তবে সংলাপ ও গতির দিক থেকে সমালোচনাও করেন তিনি। আরেকজন ছবিটিকে সরাসরি ‘সমাজের পেছনে’ বলে আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন, ইরানিদের এখন পর্দায় দেখানো বিষয়ের চেয়ে ঢের বেশি গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
এই বিভাজন সিনেমার সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর এক প্রশ্নে রূপ নিয়েছে, ইরানি সেন্সর বোর্ড যা নিষিদ্ধ করে, সেন্সরশিপ উপেক্ষা করে নির্মাতারা যা দেখাতে পারছেন, আর দর্শকরা ইতিমধ্যে যাকে স্বাভাবিক জীবন বলে মনে করছেন, এই তিনের মধ্যকার ব্যবধান ক্রমেই প্রশস্ত হচ্ছে।
যখন রাস্তাই হয়ে ওঠে মঞ্চ
‘বিদাদ’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সেতি, যাকে ফুটিয়ে তুলেছেন সারভিন জাবেতিয়ান। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই গায়িকার স্বপ্ন প্রতিনিয়ত সংঘাতে জড়ায় নারী কণ্ঠের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের সঙ্গে। ছবির শুরুর দিকে এক সংগীতশিক্ষকের কাছে সেতি প্রতিবাদ জানায়, ‘আপনারা আমার কণ্ঠ শুনতে পান না,’ আর তাকে জানানো হয়, নারী গায়িকারা সহশিল্পী পুরুষদের চেয়ে উচ্চস্বরে গাইতে পারবেন না।
সেতি এই আপস মেনে নেয় না। শেষ পর্যন্ত সে রাস্তায় গান গাওয়া শুরু করে, যেখানে পথচারীরা তার ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়, আর এভাবেই সে হয়ে ওঠে এমন এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা সরকারি প্রতিষ্ঠান যা আড়াল করতে চায়, তা প্রকাশ্যেই তুলে আনতে বদ্ধপরিকর।
ছবিটি বানাতে গিয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে নির্মাতাদের। নিরাপত্তা বাহিনী প্রযোজনা কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সরঞ্জাম ও ধারণকৃত ফুটেজ জব্দ করে, আর বেইরাগিসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী-কলাকুশলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরিচালককে দেওয়া কারাদণ্ড পরে জরিমানায় রূপান্তরিত হয়, জাবেতিয়ান এবং সেতির মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা লেইলি রশিদিকেও শাস্তি দেওয়া হয়, যদিও অন্য কয়েকজন অভিযুক্ত খালাস পান। অনলাইনে মুক্তির আগে ছবিটি কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার জিতে নেয়।
সীমারেখা কি ইতিমধ্যে বদলে গেছে
কিছু দর্শকের কাছে ‘বিদাদ’-এর মূল্য এখানেই, যা সরকার-অনুমোদিত সিনেমা কখনও দেখাতে পারেনি। একজন ইনস্টাগ্রাম মন্তব্যকারী লেখেন, বাড়িতে নারীদের স্কার্ফ বা হিজাব ছাড়া দেখানোটাই বড় প্রাপ্তি, আর জীবন থেকে নেওয়া বলেই ছবিটি আরও তিক্ত মনে হয়েছে তার কাছে। আরেকজন একে ইরানি নারীদের ‘জীবনের বাস্তবতা’ বলে অভিহিত করেন। তবে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এসব দৃশ্য এখনও কোনো সীমা লঙ্ঘন করে কি না-তাদের মতে, ছবিটি ইরানি সমাজের এক পুরনো পর্যায়ের উদ্বেগ নিয়ে কথা বলছে, যা মানুষের বর্তমান দাবির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
লেখক ও চলচ্চিত্র সমালোচক মোহাম্মদ আবদি ‘বিদাদ’-কে ইরানের ভূগর্ভস্থ সিনেমার ধারায় ফেললেও মনে করেন, সেন্সরশিপের আরোপিত আপস পরিত্যাগ করে বেইরাগি তার সমসাময়িকদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়েছেন। আয়রন ইন্টারন্যাশনালকে তিনি বলেন, সরকারের প্রসঙ্গে ছবিটি কোনো আপস না করে সরাসরি কথা বলে এমন এক ক্লান্ত প্রজন্মের হয়ে, যারা নিজেদের দাবি রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে। ছবিটিকে সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বলা কিছু মন্তব্যকারীর দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন আবদি। তার ভাষায়, ‘ছবিটি আসলে সংস্কারবাদ ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প। সেতি এমন সব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়, যার শেষে সে বুঝতে পারে সংস্কারবাদের আর কোনো অর্থ নেই, তাকে রাস্তায় নেমেই শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।’
তবে কঠোরতর সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষত ছবিতে নিয়মভঙ্গকারীদের যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে তা নিয়ে। এক মন্তব্যকারী মদ্যপান, গাঁজা, যৌনতা ও ভাঙাচোরা সম্পর্কের প্রাধান্যের সমালোচনা করে সতর্ক করেন, এমন উপস্থাপনা দর্শকের মনে সংগীতশিল্পী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে সামাজিক বিশৃঙ্খলার সংযোগ তৈরি করতে পারে। হলিউড রিপোর্টার অবশ্য একই ছবিকে ভিন্নভাবে দেখেছে-তাদের বর্ণনায় ছবিটি ‘বিদ্রোহী ও প্রান্তিকজনদের’ এক জগৎ, যেখানে সেতি একা নন; বরং ব্যক্তিগত প্রকাশের ওপর আরোপিত সীমার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ক্রমবর্ধমান তরুণ ইরানিদের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন তিনি।
এক্সে আরেক ব্যবহারকারী ছবিটির পরিচিত ইরানি জীবনচিত্র তুলে ধরার প্রশংসা করলেও লেখেন, একসঙ্গে অনেক বেশি অন্যায়ের ভার বহনের চেষ্টা করেছে ছবিটি। যৌন হয়রানি, সেতির মাকে জিজ্ঞাসাবাদকারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করার উপকাহিনি, এবং হেফাজতে থাকাকালীন সেতির ঋতুস্রাবের দৃশ্য-এসবের কোনোটাই প্রয়োজন ছিল না বলে মত তার। এই বিতর্কই স্পষ্ট করে দেয় ‘বিদাদ’-এর অস্বস্তিকর অবস্থান-সেন্সরশিপ এড়িয়ে যে সীমা অনুমোদিত সিনেমা ছুঁতে পারে না, তা ছোঁয়া সম্ভব হলেও, দর্শকদের কাছে তা আর ততটা বিপ্লবী মনে হচ্ছে না, কারণ তাদের নিজেদের জীবন নিয়মের চেয়েও দ্রুত বদলে গেছে।
দুই প্রজন্মের মুখোমুখি
ছবির ভেতরেও একই বিভাজন প্রতিফলিত হয় সেতির সঙ্গে এক নামহীন প্রৌঢ়ের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, যাকে ফুটিয়ে তুলেছেন আমির জাদিদি। চরিত্রটি নিজেকে কেবল ‘বেবিন’ বা ‘দেখো’ নামে ডাকতে বলে।
উল্কি আঁকা, প্রায়ই নেশাগ্রস্ত এবং যেন পুরনো আদর্শ থেকে শূন্য হয়ে যাওয়া এই চরিত্র সেতির সংকল্পের বিপরীতে দাঁড়ায় বলে মনে করেন আবদি। তাদের ঘনিষ্ঠ কিন্তু প্রথাবিরুদ্ধ সম্পর্ক আসলে দুই প্রজন্মের মুখোমুখি হওয়ার গল্প, একদিকে হতাশার ভার বহনকারী প্রজন্ম, অন্যদিকে বিধিনিষেধের সঙ্গে আপস করতে অনিচ্ছুক প্রজন্ম।
ছবির সংগীত বাস্তব জীবনের সঙ্গে কাহিনির সংযোগ ঘটায়। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন পরাস্তু আহমাদি, যিনি বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়া পরিবেশনার জন্য নিজেই মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। চলতি বছরের জুনে কোমের একটি আদালত ২০২৪ সালের ‘কারাভানসরাই কনসার্ট’-এর জেরে আহমাদি ও তার আট সহশিল্পী-কলাকুশলীকে ৭৪টি করে বেত্রাঘাত, দুই বছরের শিল্পকর্ম নিষেধাজ্ঞা এবং দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার দণ্ড দেয়।
‘বিদাদ’ নির্মিত হয়েছে সরকারি অনুমোদনের বাইরে, কারণ এতে দেখানো ইরান অনুমোদিত সিনেমার নিয়মের মধ্যে থেকে দেখানো সম্ভব নয়। অনলাইনে মুক্তির পর ছবিটির প্রতিক্রিয়া আরও একটি ফাটল উন্মোচন করেছে-কিছু দর্শক নিয়ম ভাঙার এই দৃশ্য উদ্যাপন করছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, যে সমাজ আগেই এসব নিয়ম ভেঙে ফেলেছে, পর্দা কেন এখনও তার পেছনে দৌড়াচ্ছে।
কালো পোশাকে নেটিজনদের নজর কাড়লো অপু বিশ্বাস
শাহরুখ-অজয়-টাইগারকে আইনি নোটিশ
এবার সালমান শাহর ভাইকেও হত্যার হুমকি!
সোনাক্ষী সিনহার কান ধরে উঠবসের ভিডিও ভাইরাল
সালমানের বাড়ির সামনে পুলিশ কনস্টেবলের হঠাৎ মৃত্যু