হামের ভয়াবহতা বাড়ছেই, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০১ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী ৫৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মোট ৬০১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগে প্রাণ হারিয়েছে ৯০ শিশু। বাকি ৫১১ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে, যদিও সব ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে সংক্রমণের প্রকৃত বিস্তার সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই এই বিভাগে ঘটেছে। জনঘনত্ব, মানুষের উচ্চমাত্রার চলাচল এবং নগরকেন্দ্রিক বসতি ব্যবস্থাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যার প্রভাব থাকতে পারে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং রোগী শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং অভিভাবকদের সচেতন করাও জরুরি।

এদিকে মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ অতিক্রম করায় স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত সংখ্যক শিশুর মৃত্যু একটি বড় সতর্কসংকেত। এটি শুধু স্বাস্থ্যসেবার নয়, সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে আগামী সপ্তাহগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

দেশজুড়ে হামের বিস্তার যেভাবে বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ আরও অনেক পরিবারের জন্য শোকের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

AHA
আরও পড়ুন