৬৪ জেলায় ছড়িয়েছে ডেঙ্গু, আগস্টে বাড়ছে সংক্রমণ

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু। ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলাতেই এ রোগের রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। জুন ও জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ অবস্থায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কারের ওপর জোর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীর হার ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে আক্রান্তের হার পুরুষদের মধ্যে বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মৃতদের ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ নারী এবং ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ।

আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিভাগ এগিয়ে থাকলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়ও ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলাতেই কমবেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে ছয় জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলাগুলো হলো—ঝালকাঠি, খুলনা, পিরোজপুর, বান্দরবান, ঢাকা ও ময়মনসিংহ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৪২ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন। পিরোজপুরে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২১০ জন, মৃত্যু হয়েছে একজনের। বান্দরবানে ৪৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন দুজন। ঢাকা জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৭৫৭ জনের, মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। ময়মনসিংহে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৯৪ জন এবং মারা গেছেন ছয়জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জনে। মোট মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছরও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় ঢাকা এগিয়ে। ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২৩৫ জন। অন্য সাত বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশালে। এ বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৫৫৯ জন। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪ হাজার ১০৬ জন, খুলনায় ৩ হাজার ৪৬৬ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২২৩ জন, রাজশাহীতে ১ হাজার ১৭১ জন এবং রংপুরে ৭০৫ জন। সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে—১৩৬ জন।

কীটতত্ত্ববিদেরা আগেই সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। সরকারি তথ্যেও সংক্রমণ বৃদ্ধির সেই চিত্র স্পষ্ট। মে মাসে দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিল ৭১৪ জন। জুনে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে। জুলাইয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৯ হাজার ২০৬ জন। আর আগস্টের প্রথম ১৮ দিনেই সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২৯১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৭৪ জন। মাসভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে জুলাইয়ে—৩৪ জন। এরপর আগস্টের ১৮ দিনেই মারা গেছেন ২০ জন। জুনে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, জুন থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে এবং জুলাইয়ে তা আরও বেড়েছে। ডেঙ্গুর মৌসুমে সংক্রমণ বাড়া স্বাভাবিক হলেও এবার দেশজুড়ে রোগটি ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নেই; দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এখনই সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সারা দেশে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। বৃষ্টি থেমে গেলে বড় পরিসরে অভিযান চালানো জরুরি। যেখানে যেসব পাত্র বা কন্টেইনারে পানি জমে আছে, সেগুলো অপসারণ করতে হবে। মটকা, ড্রাম কিংবা চৌবাচ্চার মতো বড় পাত্রে পানি রাখার ক্ষেত্রে দুই-তিন দিন পরপর পুরোনো পানি ফেলে দিতে হবে এবং পাত্র ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। এভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কমানো সম্ভব।

পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার প্রস্তুতিও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য নির্দেশিকা হালনাগাদ করে গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এবং তা সারা দেশে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের অনলাইন বা সরাসরি ওরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে প্রস্তুত করার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে হাসপাতালে আইভি ফ্লুইডসহ ডেঙ্গু চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পর্যাপ্ত রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত ও সঠিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা না গেলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতি জোরদারের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডেঙ্গুবিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

Maz
আরও পড়ুন