সাত
মেয়েদের প্রতি আভা বা সত্য নারায়ণের কোনো অবহেলা ছিল না। কিন্তু একটা পুত্র সন্তান পাওয়ার প্রবল ইচ্ছে নিয়ে আরেকটি সন্তান নেওয়ার শেষ চেষ্টা ওরা করেছে। সমাজের মানুষের কাছে ওরা অশুভ, এটা কারোরই ভালো লাগে না। দিন যায়, মাস যায় আভার শরীর ভারী হতে থাকে। দিন যত যায় আভার চিন্তা বাড়তে থাকে। ভীষণ ক্লান্ত লাগে। হাত, পা অবশ হয়ে আসে। এবারো যদি মেয়ে হয়! এরপর আর কিছুই ভাবতে পারে না আভা। সবার কাছে সে অশুভ। তার জন্য সত্য নারায়ণ নিজের বাবার ভিটে ছাড়া হয়েছে। ভগবানকে সারাক্ষণ মনে মনে ডাকতে থাকে আভা। সত্য নারায়ণের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু আভা বা সত্য নারায়ণ কেউ কাউকে কিছুই বলে না। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় না তাদের। মা কালীকে প্রাণপণে ডাকছে আভা। স্টেশন বাজারের পাশে যে কালীমন্দির আছে সেখানকার মা খুব জাগ্রত। সত্য নারায়ণকে একদিন জানায় আভা, যেতে চায় মন্দিরে পুজো দিতে। সত্য নারায়ণ বুঝতে পারে কেন আভা সেখানে যেতে চায়। আভাকে একদিন নিয়ে যায় সেখানে। ফল, মিষ্টি দিয়ে ভক্তিভরে পুজো করে আভা। মানত করে যে এবারে পুত্রসন্তান দিলে মায়ের কাছে পাঠা নিবেদন করবে আভা। এদিকে সত্য নারায়ণ ও আলাদা করে মায়ের কাছে মানত করেছে। আভা এবং সত্য নারায়ণ খেয়াল করলো দুজনেরই চোখ রক্ত জবার মতো লাল। দুজনেই কেঁদেছে মায়ের কাছে। মুখে হাসি রেখে দুজনের মানত গোপন করে বাড়ি ফিরলো ওরা। যেমন করে দুঃখ গোপন করে সারাদিন মুখে একটা হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করে।
ঝুম বৃষ্টি। প্রবলবেগে হাওয়া বইছে। গাছের ডালপালা ভেঙে উঠোন ভর্তি হয়ে গেছে। বাগানের পাশটার মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে কিছুটা। গাঢ় অন্ধকার ফুড়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে একটু পরপর। বাঁজ পড়ার আওয়াজে ভয়ের একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো হঠাৎ করেই। আভার শরীরটা বিকেল থেকেই খারাপ। মেয়েদের খাওয়ানো শেষ করে কলতলায় এঁটো থালাবাসন রেখেই ঘরে এসে শুয়ে পড়েছে আভা। পেটে ব্যথা আর সহ্য করতে না পেরে সত্য নারায়ণকে কাছে ডাকলো আভা। বুঝতে পারছে সময় হয়ে এসেছে। কিন্তু সত্য নারায়ণ এই আবহাওয়ায় বাইরে বের হতেও পারছে না। কী করবে বুঝতে পারছে না। কাউকে ডাকা দরকার। জঙ্গল ঘেরা বাড়িটা থেকে লোকালয় একটু দূরে। দাইয়ের বাড়ি কম করে হলেও ২ কিলোমিটার দূরে।
দাইকে বলা আছে, কিন্তু এই রাতে তাকে খবরটা পৌঁছাতে তো হবে। কোনো কিছু ভেবে না পেয়ে ছাতা নিয়ে ঝড় জলে বেরিয়ে গেলো সত্য নারায়ণ। দাইকে ডাকতেই হবে। কিন্তু সত্য নারায়ণের ফিরে আসার আগেই আভাকে খুব বেশি কষ্ট না দিয়ে কারো সাহায্য ছাড়াই পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হলো সত্য নারায়ণ আর আভার চতুর্থ মেয়ে রুম্পা। সোনালী, কাবেরী আর বেবি তাদের ছোট্ট বোনটিকে পেয়ে ভীষণ খুশি। রুম্পার হাত নাড়ানো, তাকানো, মুখ দিয়ে নানা শব্দ করা, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ে তিনবোন। সোনালী এখন অনেক দায়িত্ব নিতে শিখেছে। বোনের জামা কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করা, ঘর গোছানো, মাকে রান্নায় সাহায্য করা আরো অনেক দায়িত্ব পালন করে সোনালী। কাবেরী রুম্পাকে কোলে নিয়ে বসে থাকে। ছোট্ট বোনটার সবচেয়ে কাছে থাকে কাবেরী। বোনকে কাজল পরানো, পাউডার দেওয়া, টিপ পরানো সবটা করে ও। সারাক্ষণ বোনকে সাজিয়ে রাখতে ভালোনবাসে কাবেরী।
এদিকে আভা আর সত্য নারায়ণ পড়েছে মহা বিপদে। আবার একটা ঝড় আসতে চলেছে জীবনে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে ওরা। ফুলকাকু চতুর্থ মেয়ের কথা শুনে কেমন যেন বদলে গিয়েছে। তার কথায় বাড়ি ছাড়ার সুর স্পষ্ট। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িটা ছেড়ে গেলে ফুলকাকু খুশি হবেন, এটা বুঝতে পেরেছে সত্য নারায়ণ। আভার শরীর দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে। মন ভেঙে গেলে, নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে গেলে মানুষের শরীরের ওপর ও আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সবচেয়ে উপেক্ষিত হয় তার শরীর। সেই উপেক্ষিত শরীর বয়ে বেড়ানো বড্ড অসহ্য হয়ে ওঠে মানুষের কাছে তখন। সত্য নারায়ণ এরই মধ্যে বুড়িয়ে গেছে অনেকটা। ছোট মেয়ে, অসুস্থ আভাকে নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবে সে! চারটা মেয়ে, অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে তো দাঁড়াতে পারে না সত্য নারায়ণ।
সোমবার সকাল। সুন্দর আবহাওয়া। হালকা মিষ্টি বাতাস বইছে। কেমন যেন শরীরে, মনে আরাম দিচ্ছে সে বাতাস। সোনালী, কাবেরী স্কুলে চলে গেছে। আভা উঠোনের কোনে মাদুর পেতে রুম্পাকে খাওয়াতে ব্যস্ত। বেবি বসে ছোট বোনটার সঙ্গে কথা বলছে আর রুম্পা শব্দ করে হেসে উঠছে।
চলবে...
