জ্বালানি-খাবার খরচসহ সার্বিক পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আগামী ১০ মে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট ‘পুলিশ সপ্তাহ’। তবে জ্বালানি-খাবার খরচসহ চারদিনের পুলিশ সপ্তাহ আয়োজনে কমেছে ইভেন্টও। কমেছে পদকের সংখ্যাও। এবার পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম) পাচ্ছেন ১১৫ পুলিশ সদস্য।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো দাওয়াতপত্র গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুলিশ সপ্তাহের প্যারেডে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকবেন, পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের পদক পরিয়ে দেবেন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রথম প্রস্তুতিমূলক সভায় দুটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়। একটি হচ্ছে ৪ থেকে ৭ মে আরেকটি হচ্ছে ১১ থেকে ১৪ মে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পুলিশ সপ্তাহের ১০ মে শুরুর তারিখ নির্ধারণ করে দাওয়াতপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর নির্দেশনা মেনে কমছে পুলিশ সপ্তাহের খরচ
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারের পরিচালন ব্যয় হ্রাস করার নির্দেশনা দিয়ে গত ৯ এপ্রিল ৯ দফা নির্দেশনা দিয়ে পরিপত্র জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে; কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদান এবং সরকারি অর্থায়নে সকল বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকবে; প্রশিক্ষণ ব্যয় ব্যতীত অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস করবে হবে; সভা/সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ১০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে এবং সেমিনার/কনফারেন্স ব্যয় ২০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে; ভ্রমণ ব্যয় ৩০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে; সরকারি খাতে গাড়ি, জলযান, আকাশযান এবং কম্পিউটার ক্রয় শতভাগ হ্রাস করতে হবে; সরকারি কার্যালয়ে জ্বালানি, বিদ্যুত/গ্যাস ব্যবহার ৩০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে; আবাসিক ভবন শোভাবর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ এবং অনাবাসিক ভবন শোভাবর্ধন ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে এবং ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় শতভাগ হ্রাস।
মন্ত্রিপরিষদের সেই নির্দেশনা মানতে হচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তরকে। সেই মোতাবেক এবার পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠান আয়োজনে করা হয়েছে কাটছাঁট। সাতদিনের পুলিশ সপ্তাহকে চারদিনে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। এবার হচ্ছে না নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় সভা। প্যারেডে অংশ নেয়া পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য ছাড়া, অতিরিক্ত এসপির নিচে কাউকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে না পুলিশ সপ্তাহে।
উর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী, পুনাক বার্ষিক সমাবেশ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, উর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারগণের সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া শীল্ড প্যারেড ফাইনাল প্রতিযোগিতা, 'আইজি’জ ব্যাজ, শিল্ড প্যারেড হবে। এসবি, সিআইডি ও পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন ছাড়াও উর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারগণের সাথে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীবর্গের সম্মেলন, আইজিপির সম্মেলন ছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারদের সাথে কর্মরত পুলিশ অফিসারদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকছে।
জ্বালানী খরচ কমাতে হচ্ছে না আলোকসজ্জা, কমছে খাবার খরচও
পুলিশ সপ্তাহ উদযাপন কমিটির ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা খবর সংযোগকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী, পুলিশের সকল ইউনিটের যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহার মাসিক ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ কমানোর বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। সেটার প্রভাব তো পুলিশ সপ্তাহে পড়ছেই। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষ্যে রাজারবাগসহ পুলিশের স্থাপনা আলোকসজ্জা এবার সেটি খরচ কমাতে পরিহার করা হচ্ছে।
এবার হবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সম্মিলন
অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫’ এর উদ্বোধন করেন। এবারের মূল প্রতিপাদ্য হলো “আমার পুলিশ, আমার দেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ”। সেই পুলিশ সপ্তাহে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসেবায় পুলিশ সদস্যদের নতুন অঙ্গীকারের ওপর জোর দেয়া হলেও বঙ্গভবনে হয়নি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পুলিশের সম্মিলন অনুষ্ঠান। তবে এবার হবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সম্মিলন।
অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের কার্যালয়েও হয়নি কোনো অনুষ্ঠান। বাদ দেয়া হয়েছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে পুলিশ সপ্তাহের প্যারেডও। এবার বৃষ্টি না হলে হবে প্যারেড। সে প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এবারের পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা দরবার বা সম্মিলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বাছাইকৃত বিষয়ে কথা বলবেন সিলেকটিভ পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি(মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন পুলিশ সপ্তাহ উদযাপনে গঠিত একাধিক কমিটির সদস্য। তিনি খবর সংযোগকে বলেন, এবার পুলিশ সপ্তাহ ১০ মে শুরু হচ্ছে। চারদিনের পুলিশ সপ্তাহে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে প্যারেড অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুলিশ সপ্তাহ উদযাপনে মোট ২৪টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এবার পদক পাচ্ছেন ১১৫ পুলিশ সদস্য
অসমসাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ কাজ, গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য প্রতিবছর পুলিশ সদস্যদের বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়। এবার পুলিশের ১১৫ জনকে পদক দেয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করা হলেও কারা পাচ্ছেন সে পদক তা এখনো যাচাই-বাছাই করছে ২৪ কমিটির একটি পদক কমিটি। এবার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লেষ বিবেচনার উর্ধ্বে থেকে পদক প্রত্যাশী পুলিশ সদস্যদের প্রফাইল তৈরির কাজ চলছে। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা বেশি মূল্যায়ণ বা প্রাধান্য পেতে পারেন বলেও জানা গেছে।
পদকের ব্যাপারে এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী এবছর পদক পাচ্ছেন ১১৫ পুলিশ সদস্য। কারা পদক পাচ্ছেন তা তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন হয়ে আসলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ছয় দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করেছিলেন পলাতক শেখ হাসিনা। সে বছর রেকর্ড চার ক্যাটাগরিতে ৪০০ পুলিশ ও র্যাব সদস্য সম্মানজনক পুলিশ পদক পান। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ১১৭ জনকে, ২০২২ সালে ২৩০ জনকে এই পদক দেওয়া হয়।
পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় সাত দিনের স্থলে গত বছর ২৯ এপ্রিল থেকে ১ মে পুলিশ সপ্তাহ তিন দিনে নামিয়ে আনা হয় এবং তখন কোনো প্যারেড রাখা হয়নি। শিল্ড প্যারেডসহ অন্যান্য প্রতিযোগিতাও ছিল না তখন পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে।
