হামের চিকিৎসায় গাফিলতির জন্য দায়ীদেরকে চিহ্নিত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে তাদের শান্তির আওতায় আনাসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট (ডিএইচইএন)।
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে 'হামে শিশুমৃত্যু: জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ' শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে দাবিগুলো তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্টর সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন ফারুকী বলেন, ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামে তিনশতাধিক শিশুর মৃত্যুতে আমরা গভিরভাবে উদ্বিগ্ন ও বেদনাহত। এটি কেবলমাত্র একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট যা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা ও টিকাদান ব্যবস্থার বড় গাফিলতি বা খামখেয়ালিপনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত ৩৬৯ জন শিশু অকালেই হামের কারণে মৃত্যু বরণ করেছে। যাদের মধ্যে পরীক্ষা দ্বারা হাম নিশ্চিত হয়েছে ৭০ জনের, বাকী শিশুরা হামের উপসর্গ নিয়ে (যাদেরও হামই বলতে হবে) মৃত্যু বরণ করেছে। এ সময়ে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৫৫ হাজার এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯১৬০ জন শিশু। প্রতিবেদনের বাইরেও মৃত ও আক্রান্ত শিশু থাকার সম্ভাবনাও আছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে হামে সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুরাই আক্রান্ত হয়, তবে এ বছর ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হয়েছে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা একজন রোগীর গায়ে হামের ফুসকুড়ি/ দানা দেখা দেওয়ার ৪ (চার) দিন পূর্ব থেকে ৪ (চার) দিন পর পর্যন্ত অন্যদের মধ্যে সংক্রামিত হতে পারে। সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় টিকা নেওয়া থাকলে সে সকল শিশুদের এ রোগে সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং আক্রান্ত হলেও তা' মারাত্মক আকার ধারণ করে না। সুতরাং সময়মত টিকা দেওয়ার ঘাটতিই এ সংকটের জন্য দায়ী- যা টিকা ক্রয় ও মজুদের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যার্থতার করণে ঘটেছে বলেই বিভিন্ন তথ্য থেকে উঠে এসেছে। হামের কারণে শরীরে যে সকল সমস্যা দেখা দেয় তার প্রতিরোধে ভিটামিন এ খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন ফারুকী বলেন, পূর্বে সরকারের কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুদের ৬ মাস অন্তর ভিটামিন এ খাওয়ানো হত। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তি সরকারের সময়ে এ কর্মসূচিটিও বন্ধ হওয়ায় হামের কারণে মৃত্যুঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পত্রিকার তথ্যমতে চতুর্থ ধাপের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচ এন পি এস পি) শেষ হয় ২০২৪ এর জুনে। পঞ্চম ধাপের কার্যক্রমের প্রস্তুতি চললেও নানা কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তি সরকার টিকা ক্রয়ের যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সেটি বাতিল করে এবং ২ বছরের একটি কর্মসূচি হাতে নেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর আর টিকার জন্য অর্থ বরাদ্দ ছাড় করা হয় নি। ফলে টিকা ক্রয়ের পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে টিকা ক্রয় ও মজুদে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। সম্প্রতি ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভু একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন ক্রয় সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টিকার ঘাটতি, রোগ নজরদারির প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব, জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে না পারাই বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাব ও এ সংক্রান্ত শিশু মৃত্যুর মূল কারণ। সুতরাং অন্তর্বর্তি সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের কারো এ মৃত্যুর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্টর সহ-সভাপতি বলেন, আমরা জানি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা এ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ অর্থ বরাদ্দ করেনি। সুতরাং আমরা মনে করি আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ থেকেই স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য সংকটের পরিস্থিতিতে ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট (ডিএইচইএন) পক্ষ থেকে ১৫ দফা তুলে ধরা হয়।
১. চলমান গণটিকাদান কর্মসূচি সারাদেশে বিশেষ ভাবে জোরদার করতে হবে, যাতে দেশের প্রায় শতভাগ শিশু (১৯৫%) পূর্ণমাত্রায় টিকার আওতায় আসে।
২. সকল সরকারি হাসপাতালে বিশেষ "হাম কর্ণার" চালু করতে হবে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সকল শিশুদের নিয়মিত (৬ মাস অন্তর) ভিটামিন-এ খাওয়ানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের সম্পূর্ণ সরকারি খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের পরিবারকে উপযুক্ত সামাজিক সহায়তা দিতে হবে।
৫. যারা এ গাফিলতির জন্য দায়ী তাদেরকে চিহ্নিত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের শান্তির আওতায় আনতে হবে।
৬. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং টিকা উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৭. গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপজেলা হাসপাতাল থেকে জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। শহর এলাকাতেও ওয়ার্ড ভিত্তিক এ ধরণের কার্যক্রমের ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. ই পি আই কার্যক্রমের আওতায় টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ যোগ্য অন্যান্য রোগের টিকার ঘাটতি দ্রুত নিরসন করতে হবে।
৯. ৬টি বিভাগে জনগণের টাকায় নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে।
১০. জরুরী ভিত্তিতে স্বাস্থ্যখাতে শুন্য পদ সমূহে নিয়োগ প্রদান করতে হবে।
১১. মাঠ পর্যায়ে টিকা বহনকারীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন অনতিবিলম্বে পরিশোধ এবং নিয়মিতকরণ করতে হবে।
১২. স্বাস্থ্যকে 'জনগণের মৌলিক অধিকার' হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আইন ও বিধি দ্বারা তা নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকে মূল ভিত্তি ধরে 'জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি' প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৪. জাতীয় বাজেটের ১৫% ও জিডিপির ৫% স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রদান এবং বরাদ্দকৃত অর্থের দুর্নীতিমুক্ত ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
১৫. উপজেলা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় এবং সকল জেলা হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নিত করতে হবে এবং এ সকল হাসপাতালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী শয্যা অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ প্রদান করতে হবে। সেই সাথে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় ও চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম সভাপতিত্বে অধ্যাপক ডা. সারওয়ার ইবনে সালামের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন, অধ্যাপক ডা. মো. আবু সাইদ, ডা. মুশতাক হোসেন, ডা. এম এইচ লেলিন চৌধুরী ও অধ্যাপক ডা. কাজী রফিকুল ইসলাম।