বাস্তবায়ন সক্ষমতাই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন সময়ে বাজেট প্রণয়ন করেছে, যখন একদিকে ছিল ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিপর্যস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’, অন্যদিকে ছিল নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তাঁর ভাষ্য, এ বাজেট কেবল বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়; বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা।

তিনি জানান, সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন ও গণমাধ্যমের মতামত সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। দায়িত্বশীল সমালোচনা ও গঠনমূলক পরামর্শ বাজেটকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এটিকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে। তিনি জানান, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, ব্যবসার ব্যয় কমাতে ডিরেগুলেশন ও ডিজিটাইজেশন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এসব উদ্যোগের ফলে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমে জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাত সম্প্রসারণ, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে মূলধারায় আনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’, এই তিন ধাপের ‘থ্রিআর’ কৌশল বাস্তবায়ন করছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতের ভুল নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার বিকৃতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও সরকারের পদক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কৃষি, শিল্প, সেবা, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

রাজস্ব আদায়ে সরকার করের হার বাড়াতে নয়, করভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হলেও কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এ ব্যবস্থার বাইরে থাকবে। তিনি দাবি করেন, সরকারের চার মাসের উদ্যোগে প্রথমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায় চার লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতির কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন, ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিং এবং বিদেশে বাংলাদেশভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দুটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি চূড়ান্ত হয়েছে।

একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন এবং বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে। ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত আমানতকারী ও হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ সুবিধাও রাখা হয়েছে। একইভাবে ডিপিএস হিসাব থেকেও দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।

তিনি জানান, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারা ১৮(ক) বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জনগণের সম্পদ যারা লুট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং আমানতকারীদের স্বার্থও পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কোম্পানি কর কমানো, আইপিও, ডিরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু বা আরপিওর মাধ্যমে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করলে অতিরিক্ত কর ছাড় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে সব লেনদেন সম্পন্নকারী কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর সুবিধার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি কোম্পানি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর করহার ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাবের পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের বিদ্যমান ৫ লাখ টাকার সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

আইএমএফ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার শূন্য হাতে ফেরেনি। আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচির কিছু শর্ত জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সরকার নিজ উদ্যোগেই সেই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচির সুযোগ খোলা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান। ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির সম্প্রসারণে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারি সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, এলএনজি টার্মিনাল বৃদ্ধি, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি স্থাপন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্প, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে নেওয়া কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, চাহিদাভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ দেড় দশকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দূর করেই বাজেট বাস্তবায়নে সফল হতে হবে।

তিনি জানান, বাজেটে ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগে ‘ভ্যালু ফর মানি’, ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত সময় ও ব্যয়সীমার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন শক্তিশালীকরণ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

Attr
আরও পড়ুন