প্রার্থী দুজন হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যেভাবে হবে 

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

রাষ্ট্রপতি পদে শেষ পর্যন্ত দুজন বৈধ প্রার্থী থাকলে ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো সংসদে ভোটগ্রহণের পরিস্থিতি তৈরি হবে। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছেন। কিন্তু এবার একাধিক প্রার্থী থাকলে সেই ধারায় ছেদ পড়বে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জনগণের সরাসরি ভোটে হয় না; এটি একটি পরোক্ষ নির্বাচন। নির্বাচন পরিচালনার জন্য রয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা। নির্বাচন কমিশনই এ নির্বাচনের আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

প্রথমে মনোনয়ন, এরপর ভোট

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মনোনয়নপত্র দাখিল ও যাচাই। আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য কোনো ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন এবং অন্য একজন সংসদ সদস্য সেই মনোনয়ন সমর্থন করবেন। মনোনয়নপত্র যাচাই শেষে যদি মাত্র একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকে, তাহলে ভোট ছাড়াই তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকলে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরও দুজন বা তার বেশি প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণের পথ খুলে যায়। নির্বাচন কমিশন তখন সংসদ সদস্যদের বৈঠকে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে নির্ধারিত দিনে ভোট নেয়।

কীভাবে হবে ভোট?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারা অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করে এবং ভোট দেওয়ার সময় সংসদ সদস্যকে নির্ধারিত স্থানে নিজের নাম স্বাক্ষর করতে হয়। অর্থাৎ এটি সাধারণ নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালটের ভোট নয়।

দুজন প্রার্থী থাকলে প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে তাদের একজনকে ভোট দিতে হবে। এরপর নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে ভোট গণনা করবেন। আইন অনুযায়ী, প্রদত্ত ভোটের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পাবেন, তাকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার জন্য আলাদা করে মোট সংসদ সদস্যের অর্ধেকের বেশি ভোট পাওয়ার শর্ত আইনে উল্লেখ নেই। দুই প্রার্থীর মধ্যে যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, তিনিই বিজয়ী হবেন।

ভোট সমান হলে কী হবে?

দুই প্রার্থীর ভোট সমান হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১১(৩) ধারা অনুযায়ী, প্রার্থীরা সমানসংখ্যক ভোট পেলে নির্বাচন কমিশনার লটারির মাধ্যমে নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবেন। অর্থাৎ ভোট সমতার ক্ষেত্রে পুনরায় ভোট নেওয়ার বিধান নেই; বরং আইনে সরাসরি লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

১৯৯১-এর পর আবারও কি ভোট?

সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকার নজির রয়েছে ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস বিজয়ী হন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

ফলে এবার দুজন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে মাঠে থাকলে ১৯৯১ সালের পর এটি হবে একটি উল্লেখযোগ্য সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ঘটনা।

রাজনৈতিক সমীকরণের প্রভাব

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সরাসরি জনগণের ভোটে না হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়। সংসদে কোন দলের কতজন সদস্য রয়েছেন, বিরোধী দল বা জোটের অবস্থান কী এবং সংসদ সদস্যরা কোন প্রার্থীকে সমর্থন করছেন—এসব বিষয় ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী এবং বিরোধী জোটের প্রার্থী মুখোমুখি হলে সংসদ সদস্যদের ভোটের হিসাবই হয়ে উঠবে মূল বিষয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ ভোট দেবেন কি না, জোটের শরিকদের অবস্থান কী হবে এবং কোনো পক্ষ শেষ মুহূর্তে সমঝোতার পথে যাবে কি না—এসব প্রশ্নও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Maz
আরও পড়ুন