২০১৫ সালে গুমের শিকার হওয়ার পর ৬১ দিনের বন্দিজীবন এবং ভারতে দীর্ঘ নয় বছরের নির্বাসনের দুঃসহ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নিজের জীবনের কঠিন সময়ের কথা তুলে ধরেন তিনি। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করা হয়।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতে মানসিক হাসপাতালে কাটানো সময়ের স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যেতে হবে এবং পরিবার হয়তো তার কবরও দেখতে পারবে না-এমন আশঙ্কা তার মনে তৈরি হয়েছিল।
গুম থাকার সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তাকে তুলে নেওয়ার পর আট বাই চার ফুটের একটি অন্ধকার ও সংকীর্ণ কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়। সেখানে ছিল একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য নর্দমার সঙ্গে যুক্ত একটি সরু ছিদ্র। দুর্গন্ধে পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠত। মেঝেতে একটি কম্বল ও বালিশই ছিল তার শোবার ব্যবস্থা। তীব্র গরমের মধ্যে দরজার ওপরের সামান্য ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসই ছিল তার ভরসা। দরজার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা চালু রাখা হতো। হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও বন্দিদশায় তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি বলে জানান।
একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে চোখ বেঁধে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি মাইক্রোবাস এবং গভীর রাতে একটি জিপে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দীর্ঘ যাত্রার পর এক জায়গায় হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে চামচ দিয়ে নুডলস খাওয়ানো হয়। বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় সে সময় দেশের কোনো খবরই তার কাছে পৌঁছাত না। এমনকি যুদ্ধাপরাধী কামরুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও তিনি জানতেন না বলে জানান। বিষয়টি শুনে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছিলেন। ভোরের দিকে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় তাকে নামিয়ে দিয়ে অপহরণকারীরা মুখ ঢেকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। পরে একটি বিলবোর্ড দেখে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে রয়েছেন।
স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসামরিক হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন সন্দেহে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে মানসিক রোগীদের সঙ্গে রাখা এবং ওষুধ খাওয়ানোর কথা জানান তিনি। এমনকি তার চশমাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন।
দাড়ি ও চুল কেটে দেওয়ার পর নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এরই মধ্যে একদিন হাসপাতাল থেকে তার স্ত্রীর ফোন আসে। ফোনে স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনে তিনি বুঝতে পারেন, তার পরিবার তার জীবিত থাকার খবর পেয়েছে। পরে সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাংবাদিকদের টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে নিজের পরিচয় জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’
ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত এবং ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালত তাকে খালাস দেন। ভারতে থাকা অবস্থাতেই বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। পরে ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় নয় বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তিনি।
আলোচনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে নিজের দেশে ফেরার বিষয়টি উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারণেই তিনি ভারত থেকে দেশে ফিরতে পেরেছেন। এ জন্য আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবের (এপিএস) দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০১ সালে কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দলীয় আন্দোলন পরিচালনার সময় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সে সময় বিএনপি তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
রাজধানীর যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহ ভেঙে বিচ্ছিন্ন '৭৫ বর্গকিলোমিটার' বরফখণ্ড
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবসময় শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছেন: পাটওয়ারী