রাজধানীতে ফিরলো পর্দাঘেরা ‘মহিলা রিকশা’

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

পর্দায় ঢাকা একটি রিকশা। শহরের ব্যস্ত সড়কে চোখে পড়লেই মনে হতে পারে, সময়ের স্রোত পেরিয়ে পুরোনো ঢাকার কোনো গলি থেকে উঠে এসেছে বাহনটি। আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে এমন রিকশা এখন বিরল। কিন্তু ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণিল শোভাযাত্রায় সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যই যেন ফিরে এল নতুন করে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে শুরু হওয়া ‘ঢাকা শোভাযাত্রা’য় পর্দাঘেরা এই ‘মহিলা রিকশা’ বিশেষভাবে নজর কাড়ে। শুধু এই রিকশাই নয়, শোভাযাত্রায় ছিল স্টিমার, ঘোড়ার গাড়ি ও পালকিও। ইতিহাসের নানা অধ্যায়, পুরোনো দিনের বাহন, স্থাপত্য, খাবার ও ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতীকী উপস্থাপনায় কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন বদলে যায় ঢাকার চেনা দৃশ্যপট।

পুরোনো ও নতুন ঢাকার মেলবন্ধন

‘ঢাকা দিবস ২০২৬—হৃদয়ে ঢাকা’ এবং ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে এ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। লক্ষ্মীবাজার থেকে শুরু হয়ে নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি নগর ভবনে গিয়ে শেষ হয়।

শোভাযাত্রায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নগরবাসীও নানা প্রতিকৃতি ও ঐতিহ্যবাহী বাহনের প্রদর্শনী উপভোগ করেন। আয়োজনের প্রতিটি উপাদানেই ছিল পুরোনো ঢাকার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। এ সময় ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাকে ট্রাকে ইতিহাস

শোভাযাত্রায় ট্রাকে করে তুলে ধরা হয় ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন স্থাপনার প্রতিকৃতি। এর মধ্যে ছিল আহসান মঞ্জিল, ঢাকেশ্বরী মন্দির, তারা মসজিদ, আর্মেনিয়ান গির্জা, জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও লালবাগ কেল্লা।

বড় ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, লালকুঠি, বৌদ্ধ মন্দির ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা গেট। এসব স্থাপনার প্রতীকী উপস্থিতি শোভাযাত্রাকে শুধু আনন্দ আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং নগরবাসীর সামনে ঢাকার ইতিহাসের নানা অধ্যায়ও তুলে ধরেছে।

ইতিহাসের মানুষও ছিলেন শোভাযাত্রায়

ঢাকার পত্তন ও বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদেরও শোভাযাত্রায় প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের কেউ সাজেন রানী ভিক্টোরিয়ার আদলে, কেউ নবাব খাজা আহসানউল্লাহ, লীলা নাগ (রায়), নিকোলাস পোগোজ, জিন্নাবাই ও পরিবিবির মতো ঐতিহাসিক চরিত্রের বেশে।

ফলে শোভাযাত্রার পথে একদিকে যেমন দেখা গেছে আধুনিক ঢাকার মানুষ, অন্যদিকে তাদের মাঝেই হাজির হয়েছে ইতিহাসের পরিচিত মুখগুলো। অতীত ও বর্তমানের এই মেলবন্ধন দর্শকদের জন্য তৈরি করে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।

খাবারের ঘ্রাণেও পুরোনো ঢাকা

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য শুধু স্থাপত্য কিংবা মানুষের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; খাবারও এই নগরের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শোভাযাত্রায় তাই জায়গা পেয়েছে পুরান ঢাকার জনপ্রিয় খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতির প্রতীকী উপস্থাপনা।

বাকরখানি, নান্না বিরিয়ানি ও বিউটি লাচ্ছির প্রতিকৃতিও ছিল শোভাযাত্রায়। এসব পরিচিত নাম ও খাবারের প্রতীকী উপস্থিতি পুরান ঢাকার স্বতন্ত্র খাদ্যঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।

ফিরে এল হারিয়ে যাওয়া বাহন

শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ ছিল পুরোনো দিনের যাতায়াতব্যবস্থার প্রতীকী উপস্থাপনা। স্টিমার, ঘোড়ার গাড়ি, পালকির পাশাপাশি ছিল পর্দাঘেরা ‘মহিলা রিকশা’।

একসময় ঢাকার রাস্তায় এ ধরনের বাহন ছিল পরিচিত দৃশ্য। বিশেষ করে নারীদের চলাচলে পর্দাঘেরা রিকশার ব্যবহার পুরোনো নগরজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতি। আধুনিক যানবাহনের বিস্তারে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। ফলে শোভাযাত্রায় ‘মহিলা রিকশা’ দেখে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে পুরোনো ঢাকার সেই সময়।

এক শহরের ৪১৬ বছরের গল্প

ডিএসসিসির মাসব্যাপী ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের অংশ হিসেবেই ২৮ আগস্ট লক্ষ্মীবাজার থেকে নগর ভবন পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, ভিনটেজ গাড়ি ও পালকিসহ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

শুক্রবারের আয়োজনটি যেন সেই পরিকল্পনাকেই আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। স্থাপনা থেকে খাবার, ঐতিহাসিক ব্যক্তি থেকে পুরোনো দিনের বাহন—ঢাকার অতীতের নানা অনুষঙ্গ একসঙ্গে হাজির হয়েছে একই শোভাযাত্রায়।

পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের মুগ্ধতা বলছিল, আধুনিক নগরের ব্যস্ততার মাঝেও পুরোনো ঢাকার স্মৃতি এখনো মানুষের আবেগে গভীরভাবে বেঁচে আছে।

ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি তাই কেবল একটি শহরের বয়স গণনার আয়োজন ছিল না। এটি ছিল নগরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন করে মনে করার উপলক্ষ। পর্দাঘেরা সেই ‘মহিলা রিকশা’ থেকে শুরু করে ঘোড়ার গাড়ি, পালকি কিংবা পুরোনো স্থাপনার প্রতিকৃতি—সবকিছু মিলিয়ে শোভাযাত্রাটি যেন একটি বার্তাই দিয়েছে, ঢাকা বদলেছে, কিন্তু তার ইতিহাস এখনো মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।

এমএজেড
আরও পড়ুন