সড়কে চলছে অনুমোদনহীন ৮২৯ স্লিপার বাস

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

দূরপাল্লার যাত্রায় আরামদায়ক ভ্রমণের সুবিধায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্লিপার কোচ। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অনুমোদন ছাড়াই দেশের সড়কে ৮২৯টি স্লিপার বাস চলাচল করছে বলে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অথচ কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন দেয়নি বিআরটিএ।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টে বিআরটিএর পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। শুনানি শেষে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো স্লিপার বাস মহাসড়কে চলাচল করতে পারবে না। পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলা বাসের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিআরটিএ।

তবে অনুমোদন না থাকার পরও ৮২৯টি স্লিপার বাস কীভাবে সড়কে চলাচলের সুযোগ পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ বাস হিসেবে নিবন্ধনের পর কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার কোচে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট কীভাবে নবায়ন হয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ জানান, অনেক বাস শুরুতে সাধারণ একতলা বাস হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মালিকরা কাঠামো পরিবর্তন করে সেগুলোকে স্লিপার কোচে রূপান্তর করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আমদানি করা বেশ কিছু চেসিস একতলা বাস নির্মাণের উপযোগী। পরে স্থানীয় গ্যারেজ ও বডি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব চেসিসে স্লিপার কিংবা ডাবল ডেকার কোচ তৈরি করা হচ্ছে। এতে বাসের উচ্চতা, ওজন, ভারসাম্য এবং যাত্রী ধারণক্ষমতায় পরিবর্তন আসছে। অনুমোদিত নকশার বাইরে এ ধরনের পরিবর্তন যাত্রী নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পরিবহন ও দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, বাসের কাঠামো পরিবর্তনের ফলে চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেকিং ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। পাশাপাশি গ্যারেজে অনুমোদনহীনভাবে কাঠামো পরিবর্তনের পরও সেগুলো সড়কে ওঠার আগে শনাক্ত করা যায়নি কেন, সেই প্রশ্নও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার, মানিকনগর ও যাত্রাবাড়ীতে দীর্ঘদিন ধরে স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি ও পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। গত ১৯ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগে ১৮ আগস্ট গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের ১০ থেকে ১২টি গ্যারেজ পরিদর্শন করে চারটিকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় আটটি গাড়ি ডাম্পিং ও দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। পাশাপাশি একটি গ্যারেজ সিলগালা করা হয়।

বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসুদের অভিযোগ, বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব বাসের নিবন্ধন ও রুট পারমিট দিয়েছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, নিবন্ধনের সময় বাস একতলা থাকার পর পরবর্তী সময়ে কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি ফিটনেস পরীক্ষায় ধরা পড়ল না কেন এবং পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে রুট পারমিট কীভাবে নবায়ন করা হলো—এসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন।

স্লিপার কোচের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান। গত ২০ আগস্ট শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচলের তথ্য জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল আদালত অনুমোদন ছাড়া স্লিপার বাস চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন।

এদিকে সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনাও স্লিপার কোচের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৯ জানুয়ারি মিরসরাইয়ে ট্রাকের পেছনে স্লিপার কোচের ধাক্কায় তিনজন নিহত হন। মার্চে বিরামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে ধাক্কা লেগে নিহত হন দুজন। ১৭ আগস্ট দাউদকান্দিতে একটি স্লিপার কোচে আগুন লাগে। পরে ৪ সেপ্টেম্বর কলাপাড়ায় একটি ডাবল ডেকার স্লিপার বাস পুকুরে পড়ে ১৫ জন আহত হন।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া মোটরযানের নির্ধারিত অবয়ব, কাঠামো, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা বা আসনবিন্যাস পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ফলে বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া চলাচলকারী এসব স্লিপার বাসের বৈধতা এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই এখন জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত