আসিফ মাহমুদের দেশ ছাড়ার শঙ্কা!

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান চলাকালে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে পারেন এমন আশঙ্কায় আসিফ মাহমুদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আবেদন করা হবে।

দুদকের এক কর্মকতার বরাত দিয়ে এমন খবর জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় এক পত্রিকা। প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তা বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। তিনি দেশত্যাগ করলে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করা হবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, সরকারি পদে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথিপত্রের বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে।

দুদকের কাছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ওই অর্থ পাচার করে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে ভিলা কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।

বিদেশে অর্থ পাচারের পাশাপাশি সরকারি পদে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

দুদকের তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা এবং এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগও করা হয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও পেয়েছে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদায়নের জন্য ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫ লাখ এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।

দুদকের অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও তাঁর সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।

এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে পাওয়া নতুন অভিযোগগুলোও ওই অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানায় সংস্থাটি।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও দুদকের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন আসিফ মাহমুদ। গত ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

পরে তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জনি দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের কাছে আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

গত ১১ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, কোনো তদন্তের ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের বক্তব্যের কারণে তাঁকে নিয়ে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়েছে। এতে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে এমন ধারণা তৈরি হয়ে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

দুদক অবশ্য জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবে নয়, বরং অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এএম
আরও পড়ুন