রোগীদেরকে জিম্মি করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট চলছে

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ এএম

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসা ও যাওয়া রোগীদের জিম্মি করে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। 

 

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর এবং মৃত ব্যক্তির লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন স্বজনরা। প্রাইভেট কার ও প্রাইভেট মাইক্রোবাস শুধু রোগী আনা-নেয়া করতে পারে, কিন্তু লাশ নিতে পারে না। এর মধ্যেও ধর্মঘটকারীরা তাদেরকে বাধা দিচ্ছেন, যাতে রোগীদেরকে হাসপাতালে আনা-নেয়া করতে না পারে। 

 

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে ধর্মঘটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন ও উপদেষ্টা মোহাম্মদ ওসমান আলী। 

 

ওসমান আলী বলেন, হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো: ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেয়ার পর হাসপাতাল থেকে বেসরকারি সব অ্যাম্বুলেন্স বের করে দিয়েছেন। পরে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করানো হয়। সেখানে সিসি ক্যামেরা, লাইট ও গেটও স্থাপন করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেখান থেকেও তাদের গাড়ি বের করে দেয়া হয়।

 

তিনি বলেন, রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স রাখলেও পুলিশের সার্জেন্ট মামলা দেন। হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স রাখার জন্য আমলাদের কয়েক লাখ টাকা দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে পার্কিংয়ের দাবিতে ধর্মঘট পালন করছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বন্ধ রয়েছে। 

 

তিনি আরো বলেন, নতুন ভবনের নিচে যে পার্কিংয়ের জায়গায় তারা সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন, সেখানে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিতেও তারা রাজি। পার্কিংয়ের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।

 

এদিকে, অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কটে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে হাসপাতালজুড়ে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগী এই হাসপাতালে আসা-যাওয়া করেন চিকিৎসার জন্য। হাসপাতালের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা রোগীদেরকে জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতেন। 

 

এক কথায় বলা যায়, তাদের কাছে রোগী ও রোগীর স্বজনরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা আরও অভিযোগ করে বলেন, এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে অনেক দালাল আমদানি হয়েছে। দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রোগী ও মরদেহ নেয়ার জন্য ভাড়া ঠিক করতে হয়। 

 

কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে আকলিমা খাতুনকে (৫৬) তার ছেলে মোহাম্মদ সেলিম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। বার্ধক্যজনিত কারণে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করিয়েছিলেন। 

 

ছেলে সেলিম জানায়, এখানে সুচিকিৎসা না পেয়ে তার মাকে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু এই সময় কোনো অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার কারণে অবশেষে প্রাইভেট কার দিয়ে বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যান। 

 

তিনি হাসপাতাল থেকে যাওয়ার আগে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, তাদের যে দাবি—এ দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। রোগীদেরকে জিম্মি করে এসব দাবি আদায় করা উচিত নয়। তারা রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে গলাকাটা টাকা হাতিয়ে নেবেন, প্রতিবাদ করলেই তখন তারা আন্দোলনে যাবেন। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মালিকরা সরকারকেও ঠকাচ্ছেন এবং রোগীদেরকে জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। সরকারের কাছে আমার আবেদন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। হাসপাতালে আগত একাধিক রোগী ও রোগীর স্বজনদের থেকেও একই অভিযোগ জানা যায়।

 

লালবাগ থেকে আগত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত তানভীর আহমেদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসেও এমন বিপদে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও চোখে পড়েনি। চিকিৎসা শেষে বাসায় যাওয়ার জন্য সরকারি ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও না পাওয়ার পর অবশেষে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবস্থা করতে হলো। এক কথায় হাসপাতালে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি।

 

খিলগাঁও তিলপাপাড়া থেকে আসা আবু জাফর জানান, আমার ছোট ভাই মোহাম্মদ ফারুক (১৯) অতিরিক্ত জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। জরুরি বিভাগ থেকে নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসাধীন রাখেন। 

 

আবু জাফরের অভিযোগ, ঢাকার মধ্যে রোগীদের আনা-নেওয়ায় এত দুর্ভোগ পোহাতে হবে—তা আমার জানা ছিল না। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে থাকেন, আবার তারা আন্দোলন করেন! আমরা কোন দেশে বসবাস করছি? হাসপাতালে এরপর লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাওয়া যায় না। লাশ নিয়ে স্বজনরাও ভুগতে থাকেন। অবশেষে পিকআপ ভ্যান দিয়ে স্বজনরা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের মরদেহ নিয়ে যেতে বাধ্য হন। আবার অনেকের স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে লাশ নেয়ার গাড়ি না পেয়ে অসহায়ের মতো বসে থাকতে দেখা যায়। এত বড় সরকারি হাসপাতালে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিক্যালের কয়েকজন কর্মচারী জানান, সকাল থেকে রোগী এবং লাশ এখান থেকে অনেকে অটোরিকশা, সিএনজি এমনকি পিকআপ ভ্যানে করে আনা-নেওয়া করছেন। ঢাকা মেডিক্যালের বাইরে থেকেও অনেক অ্যাম্বুলেন্স আসলেও এখান থেকে কাঙ্ক্ষিত কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না রোগী ও তার স্বজনরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশ এবং রোগী নিয়ে অপেক্ষা করলেও অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না তারা। এখানে পরিচালকের উচিত অ্যাম্বুলেন্স নেতাদের সাথে বসে এই বিষয়টি সমাধান করা।

 

এ বিষয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাক্তার মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সাথে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে মাঝে মাঝেই আনা-নেয়া করা হয়, আবার অনেক সময় হাসপাতালের জরুরি কাজে ব্যবহৃত হয়। আমাদের হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা মাত্র পাঁচটি, এর মধ্যে দুটি নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও রোগীদের বিষয় বিবেচনা করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে রোগীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা উচিত।

 

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সাথে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা সরকারি জায়গা দখল করছে এবং রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রোগীদেরকে আনা-নেয়া করবে- এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের হাসপাতালের জায়গা দখল করে গাড়ি রাখবে আর রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া নেবে, এতে করে আমাদের হাসপাতালের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। রোগীদের যাতায়াতের ব্যাপারে কী ধরনের ব্যবস্থা করা যায়, সেই ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এইচএন
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত