বর্তমান যুগে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন কমছে। খবর পড়ে, শুনে বা দেখে সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখছেন—সংবাদটি কতটুকু সত্য, কতটুকু বিকৃত। এই অবিশ্বাসের পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে মালিকদের স্বার্থান্বেষী হস্তক্ষেপ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে উঠে এসেছে, সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় মানুষ তথ্যসংগ্রহের বিকল্প পথ খুঁজছে। শিক্ষক সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে উঠে এসেছেন—৪২ দশমিক ৪১ শতাংশ মানুষ শিক্ষকদের বিশ্বাস করেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আস্থা রাখেন মাত্র ২৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। টেলিভিশনকে বিশ্বাস করেন ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আর সংবাদপত্রে আস্থা রাখেন মাত্র ৪ দশমিক ১১ শতাংশ মানুষ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ‘মিডিয়া’-র ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, বেশিরভাগ গণমাধ্যমই বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অধীনে পরিচালিত। এসব মালিকের নিজস্ব ব্যবসা, রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকে। ফলে যখন সংবাদ তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তখন সেই খবর দমন করা হয় অথবা গুরুত্ব কমিয়ে উপস্থাপন করা হয়। আবার উল্টোটা ঘটে যখন কোনো ইস্যু মালিকের স্বার্থে যায়—সেক্ষেত্রে মিডিয়া সেটাকেই বড় করে তোলে।
যেমন, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হলেও মালিকের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের সম্পর্ক থাকলে সেই সংবাদ পত্রিকার প্রথম পাতায় আসে না। আবার রাজনৈতিকভাবে কোনো দলের পক্ষে সংবাদ ছাপার নির্দেশ দিয়ে দেন মালিক। এতে সাংবাদিকরা বিব্রত অবস্থায় পড়েন—তিনি সত্য লিখতে চান, কিন্তু সম্পাদক কিংবা মালিকপক্ষ বলছেন অন্য কিছু লিখতে।
এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪৭ দশমিক ২২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারছেন না। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে—পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী শাসনের নিয়ন্ত্রণ ও ভীতি এবং মালিকদের অর্থনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থ।
চলতি বছরের ২ মে বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ সরাসরি স্বীকার করেন, ‘আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ অনুভব করি না, তবে মালিকদের পক্ষ থেকে চাপ দেখতে পাই।’ তার মতে, বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটের মূল কারণ হচ্ছে মালিকদের নিয়ন্ত্রণ ও করপোরেট স্বার্থ।

তিনি আরও বলেন, ‘সংসদে প্রধানমন্ত্রী যখন পাচারকারী ও খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ঘোষণা করেন, তখন অনেক সংবাদমাধ্যম পুরো তালিকা প্রকাশ করে না। বিশেষ করে তাদের নিজস্ব মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া হয়। এরপর সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকে?—প্রশ্নটি স্বাভাবিক।’
সাংবাদিকতার মূল কথা—নির্ভীক, নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন। কিন্তু মালিকের হস্তক্ষেপ সেই পবিত্রতাকে নষ্ট করে দেয়। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার নামে সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞাপনদাতা ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের খুশি রাখার পথ বেছে নেয়। এতে সাধারণ মানুষ খবর পায় শুধু ফিল্টার করা তথ্য।
গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—
১. স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো প্রতিষ্ঠা: মিডিয়া সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে বড় ও মাঝারি সংবাদমাধ্যমকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে। এটি মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে।
২. স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা: একটি স্বাধীন ‘ন্যাশনাল মিডিয়া কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সংস্থা অভিযোগ শুনানি, নৈতিকতা নির্দেশিকা বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
৩. সাংবাদিক সুরক্ষা আইন: ‘জার্নালিস্ট প্রোটেকশন ল’ নামে একটি নতুন আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা সাংবাদিকদের হয়রানি ও ভীতিমুক্ত রাখতে সহায়ক হবে।
৪. টেকসই অর্থনৈতিক মডেল: সংবাদমাধ্যমকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। সরকার বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সহায়তায় নির্ভরশীল হলে স্বাধীনতা আপোস হবে।
৫. নৈতিকতার চর্চা: সাংবাদিক ও সম্পাদকদের পেশাদার নৈতিকতার দিকে ফিরে আসতে হবে।
গণমাধ্যম যদি বিশ্বাস হারায়, তাহলে সেটা গণতন্ত্র ও সমাজের জন্য বড় সংকট। তাই মালিকদের বুঝতে হবে, তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিজস্ব স্বার্থকেই নষ্ট করছে। নির্ভীক গণমাধ্যমই পারে টিকতে মানুষের হৃদয়ে। সেটা না হলে শুধু পত্রিকা বিক্রি হবে, বিশ্বাস নয়। সাংবাদিক, মালিক, সরকার ও সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিরিয়ে আনতে হবে গণমাধ্যমের সেই পুরোনো দিন, যখন খবর ছিল খবর, মালিকের স্বার্থ নয়।
সুশাসনে নজর দিতে হবে॥ কাউছার খোকন
স্মার্টফোনের ফাঁদে সামাজিকতা॥ কাউছার খোকন