হরমুজে নজরদারিতে পি-৮ পোসাইডন বিমান পাঠাবে দক্ষিণ কোরিয়া

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে নজরদারি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সহায়তা করতে সামরিক সদস্য ও সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। সম্ভাব্য এই মোতায়েনের অংশ হিসেবে পি-৮এ পোসাইডন সামুদ্রিক টহল বিমান, মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞ এবং একটি নৌ-লজিস্টিক সহায়তা জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

রয়টার্সের বরাত দিয়ে আর্মি রিকগনিশন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে সিউল। তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।

প্রস্তাবিত বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা হবে পি-৮এ পোসাইডন বিমান। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বর্তমানে এই ধরনের মাত্র ছয়টি বিমান রয়েছে। এগুলো মূলত সাবমেরিনবিরোধী অভিযান, নৌযান শনাক্তকরণ এবং গোয়েন্দা, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য তৈরি।

হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করা হলে এসব বিমান ইরানি নৌযান, সাবমেরিন এবং অন্যান্য সামুদ্রিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগর ও ওমান উপসাগরের বিস্তৃত এলাকায় টহল দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করতেও সক্ষম হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পি-৮এ পোসাইডন শুধু নজরদারির জন্য নয়, প্রয়োজন হলে সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতাও রাখে। এতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও হালকা টর্পেডো বহনের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে সিউল যদি বিমানগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তাহলে এগুলো ইরানি নৌবাহিনীর জাহাজ বা সাবমেরিন শনাক্ত করার পাশাপাশি হামলাতেও সহায়তা করতে পারে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বড় সীমাবদ্ধতা হলো বিমানটির সংখ্যা। ছয়টি পি-৮এর মধ্যে মাত্র দুই বা তিনটি হরমুজে পাঠানো হলেও দেশের পুরো বহরের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত দূরবর্তী অঞ্চলে নিয়োজিত হয়ে যাবে। এতে উত্তর কোরিয়ার সামুদ্রিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ ও নিজেদের উপকূলীয় নিরাপত্তায় চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া হরমুজে মাইন শনাক্ত ও অপসারণকারী বিশেষজ্ঞ পাঠানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে সমুদ্রপথে মাইন পেতে রাখার আশঙ্কা থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সরু এই জলপথে অল্পসংখ্যক মাইনও ট্যাংকার চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি করতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ ও মাইন অপসারণকারী দলগুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে পানির নিচে থাকা বিস্ফোরক শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে পারে। আর সম্ভাব্য লজিস্টিক সহায়তা জাহাজটি দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকা বিমান ও সামরিক সদস্যদের জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে সহায়তা করবে।

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬১ শতাংশ এবং ন্যাফথার ৫৪ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে এসেছে। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া এর আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের কাছাকাছি এডেন উপসাগরে জলদস্যুবিরোধী অভিযানে চেওংহে ইউনিট মোতায়েন করেছে। তবে হরমুজে সম্ভাব্য অভিযান আরও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কারণ সেখানে মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন ও ছোট নৌযানের পাশাপাশি উপকূলীয় হামলার আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই মোতায়েনের মাধ্যমে সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে হামলায় না জড়িয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারবে দক্ষিণ কোরিয়া। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবে সিউল।

তবে পি-৮এ পোসাইডন পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলে তা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ হবে। কারণ দেশটির মাত্র ছয়টি এ ধরনের বিমান রয়েছে এবং সেগুলোর একটি বড় অংশকে হরমুজে পাঠানো মানে উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে নিজস্ব সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি করা। সূত্র: গ্লোবাল ডিফেন্স নিউজ

এএস
আরও পড়ুন